এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-২ অভিযানে প্রথম ম্যাচেই পয়েন্ট সংগ্রহ করল ইস্টবেঙ্গল। জর্ডনের শক্তিশালী দল আল হুসেইনের বিরুদ্ধে ২-২ গোলে ড্র করে প্রতিযোগিতায় নিজেদের যাত্রা শুরু করল লাল-হলুদ ব্রিগেড। ম্যাচের প্রথমার্ধে দুর্দান্ত ফুটবল খেলে ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত জয় ধরে রাখতে পারেনি কলকাতার দল। দ্বিতীয়ার্ধে প্রতিপক্ষ পরপর দুটি গোল করে সমতা ফেরায়। ফলে জয় হাতছাড়া হলেও এশীয় মঞ্চে প্রথম ম্যাচ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নিয়ে ফিরছে ইস্টবেঙ্গল।
এই ম্যাচকে ঘিরে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা ছিল। ঘরোয়া ফুটবলে সাম্প্রতিক ভালো পারফরম্যান্সের পর আন্তর্জাতিক মঞ্চে দল কেমন খেলবে, সেদিকেই নজর ছিল সকলের। কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের দল শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামে। প্রতিপক্ষের মাঠে খেলতে নেমেও লাল-হলুদ ফুটবলাররা নিজেদের মধ্যে দ্রুত পাস খেলে আক্রমণ গড়ে তুলতে থাকেন। তারই ফল হিসেবে প্রথমার্ধে দুটি গোল পেয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল।
ম্যাচের শুরু থেকেই ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণ ছিল বেশ ধারালো। মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে আল হুসেইনের রক্ষণে চাপ তৈরি করতে থাকে তারা। ম্যাচের মাত্র ৯ মিনিটের মাথায় দানি রামিরেজের গোলে এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল। দ্রুত আক্রমণ থেকে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে জর্ডনের দলের জালে বল জড়ান স্প্যানিশ তারকা। এই গোলের পর ইস্টবেঙ্গলের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। দলের আক্রমণভাগ একের পর এক সুযোগ তৈরি করতে থাকে।
প্রথম গোলের পরও আক্রমণের ধার কমেনি। ইস্টবেঙ্গলের উইং প্লে এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় পড়ে আল হুসেইন। প্রথমার্ধের শেষ দিকে দ্বিতীয় গোল পেয়ে যায় লাল-হলুদ দল। অনোয়ার আলির গোলে ব্যবধান ২-০ করে ইস্টবেঙ্গল। সেট-পিস পরিস্থিতি থেকে উঠে এসে গুরুত্বপূর্ণ গোল করেন ভারতীয় ডিফেন্ডার। দুই গোলে এগিয়ে গিয়ে প্রথমার্ধ শেষ করে ইস্টবেঙ্গল। সেই সময় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই হাবাসের দলের হাতে ছিল।
তবে দ্বিতীয়ার্ধে সম্পূর্ণ বদলে যায় ম্যাচের ছবি। আল হুসেইন আক্রমণের গতি বাড়ায় এবং ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণে চাপ তৈরি করতে শুরু করে। প্রথমার্ধে যে দলটি আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছিল, দ্বিতীয়ার্ধে সেই দলকেই বেশিরভাগ সময় রক্ষণ সামলাতে দেখা যায়। ইস্টবেঙ্গলের মাঝমাঠ ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে এবং প্রতিপক্ষ নিজেদের আক্রমণ আরও সংগঠিত করে।
ম্যাচের ৬১ মিনিটে আল হুসেইন প্রথম গোলটি করে ব্যবধান কমায়। এই গোলের পর জর্ডনের দল আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। ইস্টবেঙ্গল চেষ্টা করছিল দ্রুত পালটা আক্রমণে গিয়ে তৃতীয় গোল করতে। কিন্তু প্রতিপক্ষের চাপের কারণে সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি। ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণকে বারবার পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়। গোলরক্ষক এবং ডিফেন্ডারদের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেভ ও ক্লিয়ারেন্স করতে হয়।
শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ৮৭ মিনিটে দ্বিতীয় গোল করে সমতা ফেরায় আল হুসেইন। ফলে ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও জয় হাতছাড়া হয় ইস্টবেঙ্গলের। শেষ কয়েক মিনিটে দুই দলই জয়সূচক গোলের চেষ্টা করলেও আর কোনও গোল হয়নি। ২-২ ফলেই ম্যাচ শেষ হয়। আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রথম ম্যাচ থেকে একটি পয়েন্ট পাওয়া গেলেও ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনা করলে ইস্টবেঙ্গল শিবিরে হতাশা থাকাটাই স্বাভাবিক।
এই ড্রয়ের ফলে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-২-এর গ্রুপ ডি-তে একটি পয়েন্ট নিয়ে অভিযান শুরু করল ইস্টবেঙ্গল। গ্রুপে তাদের সঙ্গে রয়েছে আল হুসেইন ছাড়াও ইরাকের আল-শোরতা এবং ওমানের আল-সিব। ফলে পরবর্তী ম্যাচগুলিতে প্রতিটি পয়েন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। গ্রুপের শীর্ষ দুই দলের মধ্যে জায়গা করে নিতে হলে ঘরের মাঠে জয় পাওয়ার পাশাপাশি বিদেশের ম্যাচ থেকেও পয়েন্ট সংগ্রহ করতে হবে।
ইস্টবেঙ্গলের পরবর্তী ম্যাচ ঘরের মাঠে আল-শোরতার বিরুদ্ধে। আগামী ১৩ অক্টোবর কলকাতায় এই ম্যাচ হওয়ার কথা। সেই ম্যাচে জয় পেলে গ্রুপের সমীকরণে অনেকটাই সুবিধাজনক জায়গায় চলে আসতে পারে লাল-হলুদ দল। ঘরের মাঠে সমর্থকদের সামনে খেলার সুবিধা কাজে লাগিয়ে তিন পয়েন্ট সংগ্রহ করাই এখন দলের প্রধান লক্ষ্য হবে। তবে তার আগে আল হুসেইনের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়ার্ধে যে সমস্যাগুলি দেখা দিয়েছে, সেগুলি বিশ্লেষণ করতে হবে কোচ হাবাসকে।
ম্যাচের পর দলের পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দানি রামিরেজের নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে। প্রথম গোল করার পাশাপাশি আক্রমণ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। তবে গোলের সুযোগ নষ্ট হওয়া এবং দ্বিতীয়ার্ধে রক্ষণাত্মক চাপ সামলাতে না পারা নিয়ে দলের মধ্যে আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। বিশেষ করে দুই গোলে এগিয়ে থাকার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে ধরে রাখা যায়, সেই বিষয়টি পরবর্তী ম্যাচের আগে গুরুত্ব পাবে।
এডমন্ড লালরিন্দিকার একটি গোলের সুযোগ নষ্ট করাও ম্যাচের আলোচনায় এসেছে। প্রথমার্ধে গোলরক্ষককে একা পেয়েও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। ওই মুহূর্তে গোল হলে ইস্টবেঙ্গলের ব্যবধান আরও বাড়তে পারত। যদিও শুধুমাত্র একটি সুযোগ নষ্ট হওয়াকে ম্যাচের ফলাফলের জন্য দায়ী করা যায় না। দ্বিতীয়ার্ধে দলের রক্ষণভাগের উপর চাপ বেড়ে যাওয়া এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারানোও ড্রয়ের অন্যতম কারণ।
কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস ম্যাচের আগে জানিয়েছিলেন, তিনি কখনও ড্রয়ের মানসিকতা নিয়ে দল নামান না। প্রতিপক্ষ শক্তিশালী হলেও নিজের দলের খেলায় বিশ্বাস রাখেন তিনি। ম্যাচের প্রথমার্ধে সেই আক্রমণাত্মক মানসিকতার প্রতিফলন দেখা গেলেও দ্বিতীয়ার্ধে দলকে আরও সংগঠিত হতে হবে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সামান্য ভুলও বড় ফলাফলে পরিণত হতে পারে। তাই পরবর্তী ম্যাচে ৯০ মিনিট একই রকম মনোযোগ ধরে রাখাই ইস্টবেঙ্গলের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে, এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-২-এর প্রথম ম্যাচে ইস্টবেঙ্গল একটি পয়েন্ট পেয়েছে। জয় না এলেও বিদেশের মাটিতে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দুই গোল করা দলের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে। তবে ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও জয় না পাওয়ার বিষয়টি অবশ্যই ভাবাবে কোচ ও ফুটবলারদের। সামনে গ্রুপ পর্বের আরও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ রয়েছে। সেখানে প্রথমার্ধের ইতিবাচক ফুটবল এবং দ্বিতীয়ার্ধের ভুল—দুই দিক থেকেই শিক্ষা নিয়ে মাঠে নামতে হবে লাল-হলুদ দলকে।
## SEO Details


