এশীয় ফুটবলের মঞ্চে নতুন চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে ইস্টবেঙ্গল। এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-টু প্রতিযোগিতার গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রথম ম্যাচে জর্ডনের শক্তিশালী ক্লাব আল হুসেইনের মুখোমুখি হতে চলেছে কলকাতার লাল-হলুদ ব্রিগেড। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের আগে দলের কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ড্রয়ের মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামবে না তাঁর দল। প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল থেকেও জয় পাওয়ার লক্ষ্যেই খেলতে চান তিনি।
আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর জর্ডনের আম্মান ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে আল হুসেইন ও ইস্টবেঙ্গল। ভারতীয় সময় অনুযায়ী ম্যাচটি শুরু হওয়ার কথা রাত সাড়ে ৯টায়। এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-টু-র এই ম্যাচকে ঘিরে ইতিমধ্যেই সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কারণ, ঘরোয়া ফুটবলে সাফল্যের পর এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করার সুযোগ পেয়েছে ইস্টবেঙ্গল।
## ড্র নয়, জয়ই লক্ষ্য
ম্যাচের আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে হাবাস জানান, কোনও ম্যাচে শুধুমাত্র ড্র করার লক্ষ্য নিয়ে দল সাজানো তাঁর নীতির মধ্যে পড়ে না। প্রতিপক্ষ যতই শক্তিশালী হোক, নিজের দলের পরিকল্পনা এবং সামর্থ্যের উপর বিশ্বাস রাখতেই চান স্প্যানিশ কোচ।
হাবাসের বক্তব্যের মূল সুর ছিল, ইস্টবেঙ্গলকে নিজেদের খেলায় মনোযোগ দিতে হবে। আল হুসেইনের শক্তি, ঘরের মাঠের সুবিধা কিংবা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা—সবকিছুই বিবেচনায় থাকবে। কিন্তু সেই কারণে রক্ষণাত্মক মানসিকতা নিয়ে শুরু করতে চান না তিনি। বরং সংগঠিত ফুটবল খেলে সুযোগ তৈরি করে জয় ছিনিয়ে নেওয়াই তাঁর লক্ষ্য।
এই আত্মবিশ্বাস ইস্টবেঙ্গল শিবিরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিদেশের মাটিতে ম্যাচ খেলা সবসময়ই কঠিন। তার উপর জর্ডনের আবহাওয়া, পরিবেশ, দর্শক সমর্থন এবং প্রতিপক্ষের মাঠের সুবিধা—সবকিছুই লাল-হলুদের বিরুদ্ধে যেতে পারে। তবুও হাবাসের বক্তব্য, এই ধরনের চ্যালেঞ্জ থেকেই দল নিজেদের উন্নত করার সুযোগ পায়।
## আল হুসেইনকে হালকাভাবে নিচ্ছে না ইস্টবেঙ্গল
আল হুসেইন জর্ডনের অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল ক্লাব। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ঘরোয়া ফুটবলে তাদের ধারাবাহিক সাফল্য রয়েছে। জর্ডনের প্রো লিগে টানা কয়েক মরশুম ভালো ফল করার পাশাপাশি এশীয় প্রতিযোগিতাতেও দলটি নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে।
এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-টু-র আগের অভিযানে আল হুসেইন গ্রুপ পর্বে ভালো পারফরম্যান্স করেছিল। পরবর্তী পর্যায়ে তারা কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছলেও শক্তিশালী সৌদি আরবের ক্লাব আল আহলির কাছে পরাজিত হয়ে বিদায় নেয়। ফলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে খেলার অভিজ্ঞতা তাদের যথেষ্ট রয়েছে।
এবারও নিজেদের ঘরের মাঠে শুরু করছে তারা। তাই ইস্টবেঙ্গলের সামনে কাজটা সহজ নয়। আল হুসেইনের আক্রমণভাগে নতুন কয়েকজন ফুটবলার যোগ দেওয়ায় দলটি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন হাবাস। প্রতিপক্ষের নতুন স্ট্রাইকারদের গতিবিধি এবং আক্রমণভাগের সমন্বয় আটকানো ইস্টবেঙ্গলের ডিফেন্ডারদের কাছে বড় পরীক্ষা হতে পারে।
তবে প্রতিপক্ষের শক্তি নিয়ে আতঙ্কিত নন হাবাস। বরং তাঁর বিশ্বাস, নিজেদের পরিকল্পনা ঠিকমতো কার্যকর করতে পারলে জর্ডনের দলকে সমস্যায় ফেলা সম্ভব।
## আক্রমণভাগে ভরসা ডেভিড, জেসিন ও এডমুন্ডে
আল হুসেইনের বিরুদ্ধে ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণভাগে একাধিক ফুটবলারের উপর নির্ভর করতে চাইছেন হাবাস। বিশেষ করে ডেভিড, জেসিন এবং এডমুন্ডের উপর আস্থা প্রকাশ করেছেন তিনি।
দলের আক্রমণভাগে ডেভিডের গতি এবং বল ধরে রাখার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। জেসিন টিকে তাঁর পরিশ্রম, অফ-দ্য-বল মুভমেন্ট এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ তৈরি করার দক্ষতা কাজে লাগাতে চাইবে ইস্টবেঙ্গল। অন্যদিকে, এডমুন্ড লালরিন্দিকার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সও দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
ডুরান্ড কাপের ফাইনালে এডমুন্ডের হ্যাটট্রিক ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের মনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। বড় ম্যাচে গোল করার ক্ষমতা দেখিয়ে তিনি ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছেন। এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-টু-র মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর পারফরম্যান্স তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
হাবাসের মতে, আক্রমণভাগের ফুটবলারদের শুধু গোল করার জন্য নয়, পুরো দলের প্রেসিং এবং রক্ষণাত্মক কাঠামোতেও ভূমিকা নিতে হবে। কারণ, বিদেশের মাটিতে প্রতিপক্ষকে জায়গা দিলে বিপদ বাড়তে পারে। তাই আক্রমণ ও রক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে ইস্টবেঙ্গলের অন্যতম প্রধান কাজ।
## চোট সমস্যা কাটিয়ে স্বস্তি
ম্যাচের আগে ইস্টবেঙ্গল শিবিরে কিছুটা চোট এবং ফিটনেস সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। জেসিন এবং ক্রিস ইকোনোমিডিসের মতো ফুটবলারদের নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল। তবে ম্যাচের আগে তাঁরা ফিট হয়ে উঠেছেন বলে দলের জন্য স্বস্তির খবর এসেছে।
বিশেষ করে ক্রিস ইকোনোমিডিসের উপস্থিতি ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণভাগকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এশীয় ফুটবলে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে অস্ট্রেলীয় এই ফুটবলারের। উইং থেকে আক্রমণ তৈরি করা, প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙা এবং দ্রুত আক্রমণে উঠে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে দলের সব ফুটবলার সমানভাবে প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নজর থাকবে। বিদেশের মাটিতে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে চোট, অসুস্থতা এবং ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা দলকে সমস্যায় ফেলেছিল বলেও জানা গিয়েছে। ফলে সেরা একাদশ বেছে নেওয়া হাবাসের কাছে সহজ কাজ নয়।
## মাঝমাঠ ও রক্ষণে সংগঠন জরুরি
আল হুসেইনের বিরুদ্ধে শুধু আক্রমণভাগের উপর নির্ভর করলেই চলবে না। ইস্টবেঙ্গলের মাঝমাঠকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার চেষ্টা করতে হবে। মোহাম্মদ রাশিদ এবং জেকসন সিংয়ের মতো ফুটবলারদের দায়িত্ব তাই অনেকটাই বেশি।
রাশিদের অভিজ্ঞতা এবং পরিশ্রম মাঝমাঠে ভারসাম্য আনতে পারে। জেকসনের কাজ হবে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভাঙা, বল পুনরুদ্ধার করা এবং দ্রুত আক্রমণ শুরু করা। দুই প্রান্তে বিপিন সিং এবং ক্রিস ইকোনোমিডিস থাকলে ইস্টবেঙ্গল উইং ব্যবহার করে আল হুসেইনের রক্ষণে চাপ তৈরি করতে পারে।
রক্ষণভাগেও অনোয়ার আলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন। আন্তর্জাতিক স্তরের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তাঁর পজিশনিং, ট্যাকলিং এবং লাইন ভাঙা পাস দেওয়ার দক্ষতা কাজে লাগবে। গোলরক্ষক প্রভসুখান গিলকেও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
ইস্টবেঙ্গলকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে সেট-পিস, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং বক্সের ভিতরে আল হুসেইনের স্ট্রাইকারদের মুভমেন্ট নিয়ে। প্রথম দিকে গোল হজম না করে ম্যাচের ছন্দ নিজেদের হাতে রাখাই হবে সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি।
## আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের প্রমাণের সুযোগ
ঘরোয়া ফুটবলে সাফল্যের পর ইস্টবেঙ্গলের সামনে এবার নিজেদের আন্তর্জাতিক মান তুলে ধরার সুযোগ এসেছে। এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-টু-র গ্রুপ ডি-তে ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে রয়েছে আল হুসেইন, ইরাকের আল শর্টা এবং ওমানের আল সিব। ফলে গ্রুপ পর্বে প্রতিটি ম্যাচই কঠিন হতে চলেছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রথম ম্যাচ থেকে পয়েন্ট সংগ্রহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অ্যাওয়ে ম্যাচে জয় পেলে দলের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বেড়ে যাবে। হাবাসও সেই কারণেই শুরু থেকেই ইতিবাচক ফুটবল খেলতে চাইছেন।
তবে জয় না এলেও দলের পারফরম্যান্স, সংগঠন এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ হবে। এশীয় ফুটবলে প্রতিটি ম্যাচ থেকেই অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে ইস্টবেঙ্গলকে। তরুণ ভারতীয় ফুটবলারদের জন্য এই প্রতিযোগিতা নিজেদের দক্ষতা প্রমাণের বড় মঞ্চ।
## সমর্থকদের প্রত্যাশা তুঙ্গে
ইস্টবেঙ্গলের আন্তর্জাতিক ম্যাচ ঘিরে কলকাতার সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন পর এশীয় মঞ্চে নিজেদের শক্তি দেখানোর সুযোগ পেয়েছে লাল-হলুদ। কোচ হাবাসের আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য সেই প্রত্যাশাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে ফুটবলে শুধু আত্মবিশ্বাস নয়, মাঠের পারফরম্যান্সই শেষ কথা। আল হুসেইনের বিরুদ্ধে ইস্টবেঙ্গল কতটা সংগঠিত থাকে, সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারে এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ কীভাবে সামলায়—তার উপরই ম্যাচের ফল নির্ভর করবে।
হাবাসের বার্তা অবশ্য স্পষ্ট। ইস্টবেঙ্গল ভয় পেয়ে খেলবে না। প্রতিপক্ষকে সম্মান করেই নিজেদের ফুটবল খেলবে এবং জয় পাওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করবে। এখন দেখার, কোচের এই সাহসী বার্তা মাঠে কতটা বাস্তবায়িত করতে পারে লাল-হলুদ ব্রিগেড।


