পুরুলিয়ায় বড়সড় সাফল্য পেল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাবাহিনীর নজরে থাকা মাওবাদী নেতা ‘আকাশ’কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে খবর। তাঁকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই জঙ্গলমহল ও বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমান্ত এলাকায় নজরদারি চালাচ্ছিল পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। আকাশের গ্রেপ্তারির খবর সামনে আসতেই রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং জঙ্গলমহলে মাওবাদী কার্যকলাপ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পুরুলিয়া জেলার জঙ্গলঘেরা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে এই মাওবাদী নেতাকে পাকড়াও করা হয়। গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কিছুদিন ধরে তাঁর গতিবিধির উপর নজর রাখা হচ্ছিল। পুলিশের অনুমান ছিল, তিনি ছদ্মবেশে বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করছিলেন এবং সংগঠনের পুরনো যোগাযোগ পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা করছিলেন। সেই সূত্র ধরেই অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আকাশ নামে পরিচিত এই মাওবাদী নেতার প্রকৃত নাম অসীম মণ্ডল বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ মাওবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কলেজজীবন থেকেই বামপন্থী চরমপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয় বলে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে তিনি জঙ্গলমহল ও পার্শ্ববর্তী ঝাড়খণ্ডের জঙ্গল এলাকায় সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ সময় ধরে নিরাপত্তাবাহিনীর চোখ এড়িয়ে আত্মগোপন করে থাকার কারণে তিনি মাওবাদী সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে পরিচিতি পান।
মাওবাদী নেতা কিষেণজির মৃত্যুর পর সংগঠনের পশ্চিমবঙ্গ শাখায় নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটে। সেই সময় আকাশকে রাজ্যস্তরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মাওবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলির মতে, তাঁর সঙ্গে সংগঠনের একাধিক পুরনো সদস্যের যোগাযোগ ছিল। সেই কারণেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আকাশকে গ্রেপ্তারের আগে তাঁর গতিবিধি নিয়ে বাংলা ও ঝাড়খণ্ড পুলিশের মধ্যে সমন্বয় করা হচ্ছিল। দুই রাজ্যের সীমান্তবর্তী জঙ্গল এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছিল। বিশেষ করে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়খণ্ডের সংলগ্ন জেলাগুলিতে তল্লাশি ও নজরদারি চলছিল। কারণ, এই বিস্তীর্ণ জঙ্গল এলাকা অতীতে মাওবাদী সংগঠনের কার্যকলাপের জন্য পরিচিত ছিল। দুর্গম পাহাড়ি রাস্তা ও জঙ্গলপথ ব্যবহার করে নিরাপত্তাবাহিনীর চোখ এড়ানোর চেষ্টা করত চরমপন্থীরা।
পুলিশের দাবি, আকাশের গ্রেপ্তারির ফলে মাওবাদী সংগঠনের পুরনো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তাঁর কাছ থেকে কোনও অস্ত্র, নথি, মোবাইল ফোন বা যোগাযোগের সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তাঁর সঙ্গে কারা যোগাযোগ রাখতেন, সংগঠনের আর কোনও সদস্য বর্তমানে সক্রিয় রয়েছেন কি না এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনও নতুন ঘাঁটি তৈরির চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেসব বিষয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
এদিকে, আকাশকে গ্রেপ্তারের খবরের মধ্যেই মাওবাদী সংগঠনের সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক মাওবাদী সদস্য আত্মসমর্পণ করেছেন বলে বিভিন্ন রিপোর্টে জানা যায়। দীর্ঘদিন জঙ্গলে থাকার পর কয়েকজন সংগঠনের সদস্য মূলস্রোতে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নিরাপত্তাবাহিনীর লাগাতার অভিযান, আত্মসমর্পণ নীতি এবং জঙ্গলমহলে প্রশাসনিক নজরদারি বৃদ্ধির ফলে মাওবাদী সংগঠনের প্রভাব কমেছে বলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলির একাংশের মত।
তবে আকাশের গ্রেপ্তারির পরেও পুলিশ সতর্ক রয়েছে। তাঁর সঙ্গে যুক্ত অন্য কোনও সদস্য এখনও আত্মগোপন করে রয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুরুলিয়া ও সংলগ্ন এলাকায় অতিরিক্ত তল্লাশি চালানো হতে পারে। বিশেষ করে বাংলা-ঝাড়খণ্ড সীমান্তে জঙ্গলপথ, গ্রামাঞ্চল এবং সন্দেহজনক আস্তানাগুলিতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এই ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মাওবাদী কার্যকলাপের ইতিহাস থাকা পুরুলিয়ার মতো এলাকায় কোনও গুরুত্বপূর্ণ মাওবাদী নেতার গ্রেপ্তারি প্রশাসনের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আকাশের বিরুদ্ধে থাকা সমস্ত অভিযোগ এবং তাঁর সাম্প্রতিক কার্যকলাপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
পুলিশ এখন আকাশকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সংগঠনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক এবং সম্ভাব্য অস্ত্রভাণ্ডার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে চাইছে। একই সঙ্গে তাঁর গ্রেপ্তারির সঙ্গে আরও কোনও অভিযান বা গ্রেপ্তারি যুক্ত হয় কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে। আপাতত পুরুলিয়া ও সংলগ্ন জঙ্গল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।


