এশীয় ক্লাব ফুটবলে নতুন অভিযানের আগে জর্ডনে অনুশীলন শুরু করল ইস্টবেঙ্গল। বুধবার এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-২-এর প্রথম ম্যাচে জর্ডনের ক্লাব আল হুসেইনের মুখোমুখি হবে লাল-হলুদ ব্রিগেড। সেই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে আম্মানে পৌঁছে প্রস্তুতি শুরু করেছে আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের দল। তবে ফুটবলীয় চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি জর্ডনের সামগ্রিক পরিস্থিতিও নজরে রয়েছে ইস্টবেঙ্গল কর্তৃপক্ষের।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-আমেরিকা সংঘাতের প্রভাব জর্ডনেও পড়েছে। কয়েক দিন আগে জর্ডনে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটি মুয়াফফর সলটি এয়ার বেস লক্ষ্য করে হামলার খবর সামনে আসে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশের মাটিতে ম্যাচ খেলতে নামার আগে নিরাপত্তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত ইস্টবেঙ্গল দলের নিরাপত্তা বা ম্যাচ আয়োজন নিয়ে কোনও বড় সমস্যার খবর পাওয়া যায়নি।
এই সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও মাঠের প্রস্তুতিতে কোনও খামতি রাখতে চাইছে না ইস্টবেঙ্গল। আম্মানে পৌঁছে স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অনুশীলন শুরু করেছে দল। পাশাপাশি জর্ডনেরই প্রাক্তন ফুটবলার এবং ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তন ডিফেন্ডার হিজাজি মাহেরের উপস্থিতি লাল-হলুদ শিবিরে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।
## আল হুসেইনের বিরুদ্ধে কঠিন পরীক্ষা
এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-২-এর গ্রুপ পর্বে প্রথম ম্যাচেই কঠিন প্রতিপক্ষের সামনে পড়তে হচ্ছে ইস্টবেঙ্গলকে। জর্ডনের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আল হুসেইনের বিরুদ্ধে খেলবে কলকাতার দল। ম্যাচটি হবে আম্মান ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়ামে।
আল হুসেইনকে জর্ডনের অন্যতম শক্তিশালী ক্লাব হিসেবে ধরা হয়। দলের একাধিক ফুটবলার জর্ডনের জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত। এমনকি ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য জর্ডনের জাতীয় দলে এই ক্লাবের পাঁচ ফুটবলার ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। ফলে প্রতিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে যথেষ্ট সতর্ক হাবাসের দল।
আল হুসেইনের আক্রমণভাগও যথেষ্ট শক্তিশালী। দ্রুত আক্রমণে ওঠা, শুরু থেকেই চাপ তৈরি করা এবং নতুন স্ট্রাইকারদের মাধ্যমে গোলের সুযোগ তৈরি করা—এই বৈশিষ্ট্যগুলিই তাদের প্রধান অস্ত্র বলে মনে করা হচ্ছে। বিদেশের মাটিতে প্রথম ম্যাচ হওয়ায় ইস্টবেঙ্গলকে শুরু থেকেই সংগঠিত ফুটবল খেলতে হবে।
## ডুরান্ড কাপ জয়ের আত্মবিশ্বাস
এশীয় অভিযানের আগে ইস্টবেঙ্গলের মরশুমের শুরু অবশ্য খুব একটা খারাপ হয়নি। সদ্য ডুরান্ড কাপ জিতেছে লাল-হলুদ। ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানকে হারিয়ে সেই ট্রফি ঘরে তুলেছে তারা। এই জয় দলের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়েছে।
তবে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-২-এর মঞ্চ ডুরান্ড কাপের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে প্রতিপক্ষের শক্তি, পরিবেশ, আবহাওয়া, ভ্রমণের ধকল এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচের চাপ—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়। সেই কারণেই হাবাসের দলের সামনে বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
কোচ হাবাস অবশ্য প্রতিপক্ষকে সম্মান করলেও ড্রয়ের মানসিকতা নিয়ে দল নামাতে চান না। তাঁর বক্তব্য, নিজেদের খেলায় মনোযোগ রেখে ৯০ মিনিট সংগঠিত ফুটবল খেলতে পারলে ইস্টবেঙ্গলের জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। দলের আক্রমণভাগের ফুটবলারদের ওপরও তাঁর আস্থা রয়েছে।
## চোট-অসুস্থতায় ধাক্কা
জর্ডন সফরের আগে ইস্টবেঙ্গল শিবিরে চোট ও অসুস্থতার সমস্যা তৈরি হয়েছে। চোটের কারণে শৌভিক চক্রবর্তী এবং বরিস সিং দলের সঙ্গে যেতে পারেননি। ফলে মাঝমাঠ এবং দলের ভারসাম্য নিয়ে কিছুটা চিন্তা রয়েছে।
মহম্মদ রশিদ দলের সঙ্গে আম্মানে পৌঁছলেও সাম্প্রতিক সময়ে পিঠের সমস্যায় অনুশীলন করতে পারেননি। তাঁকে প্রয়োজন হলে ইনজেকশন নিয়ে খেলতে হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে। তাঁর ম্যাচ ফিটনেস নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে টিম ম্যানেজমেন্টকে।
অন্যদিকে, অসুস্থতার কারণে বিমানবন্দর থেকেই ফিরে যেতে হয়েছে ক্রিস ইকনোমিডিসকে। ফলে আল হুসেইনের বিরুদ্ধে তাঁর খেলার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে একাধিক খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি নিঃসন্দেহে হাবাসের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে দলের কিছু ফুটবলারের ফিটনেস পরিস্থিতিতে স্বস্তিও রয়েছে। জেসিন টিকে, পিভি বিষ্ণু এবং ক্রিস ইকোনোমিডিসের ফিটনেস নিয়ে আগের তুলনায় ইতিবাচক খবর পাওয়া গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত কাকে প্রথম একাদশে রাখা হবে, তা ম্যাচের আগে চূড়ান্ত হবে।
## প্রাক্তন সতীর্থদের সঙ্গে দেখা হিজাজির
এই কঠিন পরিস্থিতিতে ইস্টবেঙ্গলকে বাড়তি সাহায্য করেছেন জর্ডনের ফুটবলার হিজাজি মাহের। এক মরশুম আগে ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে নিজের দেশে ফিরে গিয়েছেন তিনি। বর্তমানে জর্ডনের ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত থাকা হিজাজি সোমবার আম্মানে প্রাক্তন সতীর্থদের সঙ্গে দেখা করেন।
টিম হোটেলে তাঁর হাতে বিশেষ জার্সি তুলে দেন ইস্টবেঙ্গলের সহকারী কোচ বিনো জর্জ। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মহম্মদ রশিদ, আনোয়ার আলি, প্রভসুখন গিল-সহ দলের একাধিক সদস্য। পুরনো সতীর্থদের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের শুভেচ্ছা জানান হিজাজি।
শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, আল হুসেইন সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও তিনি ইস্টবেঙ্গলকে দিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। বিশেষ করে জর্ডনের ক্লাবটির স্থানীয় ফুটবলারদের শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে হাবাসের দলকে ধারণা দিয়েছেন তিনি। ফলে প্রতিপক্ষকে বুঝতে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
## ম্যাচের সময় অনুযায়ী অনুশীলন
বিদেশের মাটিতে ম্যাচের সময় ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য সোমবার আম্মানের জাওয়া গ্রাউন্ডে অনুশীলন করেছে ইস্টবেঙ্গল। স্থানীয় সময় অনুযায়ী ম্যাচটি রাতের দিকে হওয়ার কথা। তাই একই সময়ের কাছাকাছি অনুশীলন করিয়ে ফুটবলারদের প্রস্তুত করতে চেয়েছেন হাবাস।
প্রায় দেড় ঘণ্টা অনুশীলন চলে। মাঠটি টিম হোটেল থেকে প্রায় এক ঘণ্টা দূরে হলেও অনুশীলনের পরিকাঠামো নিয়ে সন্তুষ্ট ইস্টবেঙ্গল শিবির। মঙ্গলবার আম্মান ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়ামের মূল মাঠে অনুশীলন করবে দল। সেখানেই ম্যাচের পরিবেশ, ঘাসের গতি এবং স্টেডিয়ামের পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার শেষ প্রস্তুতি হবে।
এই ম্যাচেই ইস্টবেঙ্গলের ক্রোয়েশিয়ান ডিফেন্ডার দিয়েগো জিভুলিচের অভিষেক হতে পারে। নতুন ডিফেন্ডারকে নিয়ে রক্ষণভাগে কিছুটা স্থিরতা আনার চেষ্টা করবে দল। আল হুসেইনের দ্রুত আক্রমণ সামলাতে রক্ষণভাগের সংগঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
## নিরাপত্তা নিয়ে নজর
জর্ডনে সাম্প্রতিক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে ম্যাচের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও এখনও পর্যন্ত কোনও বড় সমস্যার কথা জানা যায়নি। ইরানের হামলার প্রভাব জর্ডনের কিছু এলাকায় পড়লেও সাধারণ মানুষের ওপর হামলার খবর পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইস্টবেঙ্গল দলের যাতায়াত, অনুশীলন এবং হোটেল নিরাপত্তার দিকে নজর রাখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ম্যাচ হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে, তাই দলের পক্ষ থেকে সতর্কতা বজায় রাখা হচ্ছে।
## হাবাসের লক্ষ্য জয়
প্রতিপক্ষ শক্তিশালী হলেও হাবাসের লক্ষ্য স্পষ্ট—জয়ের উদ্দেশ্যেই মাঠে নামবে ইস্টবেঙ্গল। দীর্ঘ সফর, নতুন পরিবেশ, চোট-সমস্যা এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগকে অজুহাত করতে চাইছেন না তিনি।
ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণভাগে ডেভিড, জেসিন এবং এডমুন্ডের মতো ফুটবলারদের ওপর ভরসা রাখছেন কোচ। তাঁদের দ্রুত আক্রমণ এবং সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা আল হুসেইনের রক্ষণকে সমস্যায় ফেলতে পারে। একইসঙ্গে মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণভাগের ভুল কমানো জরুরি হবে।
সব মিলিয়ে, জর্ডনে ইস্টবেঙ্গলের এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-২ অভিযান শুরু হচ্ছে একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে। মাঠের প্রতিপক্ষ যেমন শক্তিশালী, তেমনই রয়েছে ভ্রমণ, চোট এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার চাপ। তবে ডুরান্ড কাপ জয়ের আত্মবিশ্বাস, হাবাসের কৌশল এবং হিজাজি মাহেরের স্থানীয় পরামর্শকে ভরসা করে নতুন এশীয় অভিযান শুরু করতে প্রস্তুত লাল-হলুদ। এখন দেখার, আম্মানের মাঠে ইস্টবেঙ্গল কতটা নিজেদের সেরাটা মেলে ধরতে পারে।


