ডুরান্ড কাপের ফাইনালে জায়গা করে নিল ইস্টবেঙ্গল। বুধবার কলকাতার বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে আয়োজিত প্রথম সেমিফাইনালে স্পোর্টিং ক্লাব দিল্লিকে টাইব্রেকারে ৫-৩ গোলে হারিয়ে খেতাবের শেষ লড়াইয়ে পৌঁছে গেল লাল-হলুদ শিবির। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় দু’দলের কেউই গোল করতে পারেনি। ফলে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয় পেনাল্টি শুটআউটে। সেখানে চাপের মুহূর্তে স্নায়ু ধরে রেখে বাজিমাত করে আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের দল।
এই জয় ইস্টবেঙ্গলের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ ২২ বছর পর আবার ডুরান্ড কাপের ফাইনালে উঠল কলকাতার ঐতিহ্যশালী ক্লাবটি। শেষবার ২০০৪ সালে এই প্রতিযোগিতার ফাইনালে উঠে ট্রফি জিতেছিল ইস্টবেঙ্গল। এবার সামনে ১৭তম ডুরান্ড কাপ জয়ের হাতছানি।
## গোলশূন্য ৯০ মিনিট, তারপর টাইব্রেকার
সেমিফাইনালের শুরু থেকেই ম্যাচটি ছিল যথেষ্ট টানটান। দুই দলই রক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে খেলায় নামায়। ইস্টবেঙ্গল নিজেদের রক্ষণ জমাট রেখে সুযোগ তৈরির চেষ্টা করলেও শেষ তৃতীয়াংশে সেই সুযোগকে গোলে পরিণত করতে পারেনি।
অন্যদিকে এসসি দিল্লিও পাল্টা আক্রমণে বেশ কয়েকবার ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণে চাপ তৈরি করে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনও দলই গোলের মুখ খুলতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ০-০ স্কোরলাইনেই শেষ হয় ৯০ মিনিট।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। এখানেই সামনে আসে ইস্টবেঙ্গলের গোলরক্ষক প্রভসুখন গিলের ভূমিকা।
## পেনাল্টিতে দুর্দান্ত প্রভসুখন গিল
টাইব্রেকারে প্রথম থেকেই আত্মবিশ্বাসী দেখায় ইস্টবেঙ্গলকে। আনোয়ার আলি, দানু, চুংনুঙ্গা, ক্রিস ইকোনোমিডিস এবং মহম্মদ বাসিম রশিদ—ইস্টবেঙ্গলের পাঁচ শুটারই নিজেদের পেনাল্টি সফলভাবে জালে জড়ান।
তবে লাল-হলুদের জয়ের অন্যতম বড় নায়ক অবশ্যই গোলরক্ষক প্রভসুখন গিল। টাইব্রেকারের প্রথম দিকেই তিনি এসসি দিল্লির একটি পেনাল্টি দুর্দান্তভাবে রুখে দেন। সেই সেভের পর থেকেই মানসিকভাবে এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল।
এরপর একে একে নিজেদের শট গোলে পরিণত করতে থাকেন লাল-হলুদের ফুটবলাররা। শেষ পর্যন্ত রশিদের নির্ভুল শটেই নিশ্চিত হয় ফাইনালের টিকিট। টাইব্রেকারে স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৫-৩।
## হাবাসের রক্ষণাত্মক কৌশল কাজে দিল
ইস্টবেঙ্গলের এই সাফল্যের পিছনে কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই লাল-হলুদ শিবিরের অন্যতম শক্তি ছিল তাদের রক্ষণ।
সেমিফাইনালেও সেই পরিকল্পনা বজায় রাখা হয়। এসসি দিল্লির আক্রমণভাগ যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও ইস্টবেঙ্গল তাদের গোল করার মতো পরিষ্কার সুযোগ খুব বেশি তৈরি করতে দেয়নি।
ফলে ৯০ মিনিটে গোল না হলেও রক্ষণ সামলে দলকে টাইব্রেকার পর্যন্ত নিয়ে যেতে পেরেছে ইস্টবেঙ্গল।
## আক্রমণে সমস্যা থাকলেও জয় এল
তবে শুধু জয় পেয়েছে বলেই ইস্টবেঙ্গলের পারফরম্যান্স নিয়ে সব প্রশ্ন মিটে যাচ্ছে না। ম্যাচে লাল-হলুদের আক্রমণভাগের finishing নিয়ে উদ্বেগের জায়গা রয়েছে।
একাধিক সুযোগ তৈরি হলেও সেগুলি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এমনকি ম্যাচে ইস্টবেঙ্গলের তিনটি প্রচেষ্টা গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসে।
ফলে ফাইনালের আগে এই জায়গাটি নিয়ে হাবাসকে নিশ্চয়ই ভাবতে হবে। কারণ ফাইনালের মতো বড় ম্যাচে সুযোগ নষ্ট করার খেসারত দিতে হতে পারে।
## ডুরান্ডে ইস্টবেঙ্গলের ঘুরে দাঁড়ানো
চলতি ডুরান্ড কাপের শুরুটা ইস্টবেঙ্গলের জন্য মোটেই আদর্শ ছিল না। কলকাতা ডার্বিতে মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের কাছে ১-০ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল তারা।
কিন্তু সেই হারের পর দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে লাল-হলুদ শিবির।
CISF Protectors-কে ৮-০ এবং South United-কে ৫-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ পর্বে নিজেদের শক্তি জানান দেয় তারা। পরবর্তীতে কোয়ার্টার ফাইনালে Indian Army FT-কে ১-০ গোলে হারিয়ে শেষ চারে পৌঁছে যায় দলটি।
এরপর সেমিফাইনালে এসসি দিল্লির বিরুদ্ধে গোলশূন্য ম্যাচ এবং টাইব্রেকারে জয়—এই ধারাবাহিকতা দেখিয়ে দিয়েছে যে হাবাসের দল কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেদের ধরে রাখতে সক্ষম।
## কোয়ার্টার ফাইনালে বিষ্ণুর গোল
সেমিফাইনালের আগে কোয়ার্টার ফাইনালেও ইস্টবেঙ্গলকে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। Indian Army FT-এর বিরুদ্ধে ম্যাচে ৩৯ মিনিটে পি ভি বিষ্ণুর হেড থেকেই আসে একমাত্র গোল। ক্রিস ইকোনোমিডিসের ক্রস থেকে সুযোগ কাজে লাগিয়ে দলকে এগিয়ে দেন বিষ্ণু।
তারপর পুরো ম্যাচে রক্ষণ ধরে রেখে জয় নিশ্চিত করে ইস্টবেঙ্গল।
এই ম্যাচের পরও দলের defensive organisation নিয়ে প্রশংসা হয়েছিল। সেই একই শক্তি সেমিফাইনালেও দেখা যায়।
## এসসি দিল্লির শক্তিশালী আক্রমণ আটকাল ইস্টবেঙ্গল
ইস্টবেঙ্গলের সামনে সেমিফাইনালে সহজ প্রতিপক্ষ ছিল না এসসি দিল্লি। কোয়ার্টার ফাইনালে তারা FC Raengdai-কে ৫-১ গোলে হারিয়ে শেষ চারে উঠেছিল। ম্যাচের প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়েও দ্বিতীয়ার্ধে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে তারা।
জোসেফ সানির জোড়া গোলের পাশাপাশি রদ্রিগুইনহো, জুয়ান সেবাস্তিয়ান পেনা এবং অগাস্টিন লালরোচানার গোলে বড় জয় পেয়েছিল দিল্লির দলটি।
তাই সেমিফাইনালে তাদের আক্রমণভাগকে আটকানোই ইস্টবেঙ্গলের কাছে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
## রক্ষণে নজর কেড়েছেন ইস্টবেঙ্গল
চলতি প্রতিযোগিতায় ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণ যে কতটা শক্তিশালী, তার পরিসংখ্যানও যথেষ্ট আকর্ষণীয়। সেমিফাইনালের আগে চারটি ম্যাচে তারা মাত্র একটি গোল হজম করেছিল এবং মোট ১৪টি গোল করেছিল।
সেমিফাইনালেও গোল না খেয়ে ম্যাচ শেষ করেছে তারা। অর্থাৎ প্রতিপক্ষকে ৯০ মিনিটে গোল করতে না দেওয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে হাবাসের দল।
এই রক্ষণই ফাইনালে তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হতে পারে।
## ফাইনালে কার মুখোমুখি ইস্টবেঙ্গল?
ইস্টবেঙ্গল ফাইনালে উঠে গেলেও তাদের প্রতিপক্ষ এখনও নির্ধারিত হয়নি। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট এবং ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি। সেই ম্যাচের জয়ী দলই ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের মুখোমুখি হবে।
অর্থাৎ কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের সামনে আবারও ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ডার্বি দেখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
যদি মোহনবাগান দ্বিতীয় সেমিফাইনাল জিতে ফাইনালে ওঠে, তাহলে ডুরান্ড কাপের ফাইনাল হয়ে উঠবে আরও আকর্ষণীয়।
## ফের ডার্বির সম্ভাবনা
চলতি ডুরান্ড কাপেই গ্রুপ পর্বে মোহনবাগানের কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল ইস্টবেঙ্গল। সেই ম্যাচে সাহাল আবদুল সামাদের একমাত্র গোলেই জয় পেয়েছিল সবুজ-মেরুন।
এবার যদি মোহনবাগান ফাইনালে ওঠে, তাহলে সেই হারের বদলা নেওয়ার সুযোগ পাবে হাবাসের দল।
তবে এখনই প্রতিপক্ষ নিয়ে ভাবতে চাইছেন না ইস্টবেঙ্গল কোচ। হাবাস জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট কোনও দলকে ফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে চাইছেন না তিনি। যে দল দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ভালো খেলবে, তারাই ফাইনালে উঠুক—এটাই তাঁর অবস্থান।
## ২০০৪-এর পর আবার ফাইনালে
ইস্টবেঙ্গলের ইতিহাসে ডুরান্ড কাপের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গৌরবের। শেষবার ২০০৪ সালে এই প্রতিযোগিতার ট্রফি জিতেছিল লাল-হলুদ। সেই ফাইনালে মোহনবাগানকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল তারা।
তারপর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও আর ফাইনালে পৌঁছতে পারেনি ইস্টবেঙ্গল।
২০২৬ সালে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল।
২২ বছর পর আবার ডুরান্ড কাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়ে এবার ট্রফি জয়ের স্বপ্ন দেখছে লাল-হলুদ শিবির।
## সামনে ১৭তম ডুরান্ড কাপের হাতছানি
ইস্টবেঙ্গলের ঝুলিতে বর্তমানে ১৬টি ডুরান্ড কাপ রয়েছে। ২০২৬ সালের ফাইনালে জিততে পারলে সংখ্যাটি বেড়ে হবে ১৭। অর্থাৎ ক্লাবের ইতিহাসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যোগ করার সুযোগ রয়েছে হাবাসের দলের সামনে।
তবে ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছনো যতটা কঠিন, ট্রফি জেতা তার থেকেও কঠিন। বিশেষ করে প্রতিপক্ষ যদি মোহনবাগান বা নর্থইস্ট ইউনাইটেডের মতো শক্তিশালী দল হয়, তাহলে ইস্টবেঙ্গলকে নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে হবে।
## হাবাসের সামনে এখন শেষ পরীক্ষা
আন্তোনিও হাবাসের অধীনে ইস্টবেঙ্গল এবারের ডুরান্ড কাপে ধীরে ধীরে নিজেদের উন্নত করেছে। শুরুতে ডার্বি হারলেও তারপর দলটি রক্ষণ এবং ফলাফল—দুই ক্ষেত্রেই ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে।
তবে ফাইনালে আরও বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
বিশেষ করে আক্রমণভাগের finishing-এর উন্নতি এবং সুযোগকে গোলে পরিণত করার ক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। সেমিফাইনালের মতো ফাইনালেও যদি গোলশূন্য ৯০ মিনিট হয়, তাহলে আবারও টাইব্রেকারের উপর নির্ভর করতে হতে পারে।
## প্রভসুখন গিলের আত্মবিশ্বাস বড় অস্ত্র
টাইব্রেকারে সাফল্যের পর প্রভসুখন গিলের আত্মবিশ্বাসও নিঃসন্দেহে বাড়বে। বড় ম্যাচে গোলরক্ষকের একটি সেভ পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে—সেমিফাইনালেই তার প্রমাণ মিলেছে।
প্রথম পেনাল্টি রুখে দিয়ে গিল সতীর্থদেরও বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিয়েছেন। এরপর ইস্টবেঙ্গলের পাঁচ শুটারই নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন।
ফাইনালের মতো বড় ম্যাচে এই মানসিক দৃঢ়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
## শেষ কথা
এসসি দিল্লিকে ৫-৩ ব্যবধানে টাইব্রেকারে হারিয়ে **২০২৬ ডুরান্ড কাপের ফাইনালে পৌঁছে গেল ইস্টবেঙ্গল**। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে দু’দলই গোল করতে পারেনি। ফলে ম্যাচের ফলাফল নির্ধারিত হয় পেনাল্টি শুটআউটে। সেখানে ইস্টবেঙ্গলের পাঁচ শুটারই সফল হন এবং গোলরক্ষক প্রভসুখন গিল গুরুত্বপূর্ণ একটি সেভ করে দলকে এগিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত রশিদের জয়সূচক পেনাল্টিতে নিশ্চিত হয় লাল-হলুদের ফাইনালের টিকিট।
এই সাফল্যের মাধ্যমে ২২ বছর পর আবার ডুরান্ড কাপের ফাইনালে উঠল ইস্টবেঙ্গল। শেষবার ২০০৪ সালে তারা এই প্রতিযোগিতার ফাইনালে উঠেছিল এবং মোহনবাগানকে হারিয়ে ট্রফি জিতেছিল। এবার ১৭তম ডুরান্ড কাপ জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নামবে লাল-হলুদ শিবির।
চলতি টুর্নামেন্টে ইস্টবেঙ্গলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের রক্ষণ। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে নকআউট পর্বেও দলটি খুব কম গোল হজম করেছে। সেমিফাইনালেও এসসি দিল্লির শক্তিশালী আক্রমণকে ৯০ মিনিটে গোল করতে দেয়নি তারা।
এখন ইস্টবেঙ্গলের অপেক্ষা দ্বিতীয় সেমিফাইনালের ফলাফলের জন্য। মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট এবং নর্থইস্ট ইউনাইটেডের মধ্যে যে দল জিতবে, তার বিরুদ্ধেই ২৩ আগস্টের ফাইনালে খেলবে লাল-হলুদ। মোহনবাগান উঠলে ফের এক ডার্বির উত্তেজনা তৈরি হবে, আর নর্থইস্ট উঠলে ইস্টবেঙ্গলের সামনে থাকবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে ট্রফি জয়ের চ্যালেঞ্জ।


