রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা বিল পাশ করল আমেরিকার হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস। বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে ভোটাভুটির মাধ্যমে ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট, ২০২৬’ অনুমোদিত হয়েছে। বিলের পক্ষে ভোট পড়েছে ২৬২টি এবং বিপক্ষে ১৫৯টি। এবার বিলটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পাঠানো হবে। প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর তা আইনে পরিণত হবে।
এই বিলের মূল লক্ষ্য রাশিয়ার অর্থনীতি, জ্বালানি ক্ষেত্র, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের উপর চাপ বাড়ানো। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার চলমান যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও সম্পদের জোগান কমাতেই এই পদক্ষেপ বলে জানিয়েছে বিলের সমর্থকরা। নতুন আইনের আওতায় রাশিয়ার সরকারি আধিকারিক, ব্যাঙ্ক, জ্বালানি সংস্থা এবং নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্যকারী বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বিলটির নামকরণ করা হয়েছে প্রয়াত মার্কিন সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য তিনি দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসে উদ্যোগ চালিয়েছিলেন। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই বিল নিয়ে আলোচনা চলছিল। তবে হোয়াইট হাউসের আপত্তি, দলের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য এবং প্রেসিডেন্টের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়ার প্রশ্নে বিষয়টি বারবার আটকে যায়। গ্রাহামের মৃত্যুর পরেও তাঁর উদ্যোগকে সামনে রেখে বিলটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
বিলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে দেওয়া। প্রস্তাবিত আইনে রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিকারক শীর্ষ পাঁচটি দেশের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ট্যারিফ বসানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে রাশিয়ার কাছ থেকে বড় পরিমাণে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কেনা দেশগুলি ভবিষ্যতে মার্কিন বাণিজ্যিক চাপের মুখে পড়তে পারে।
এই বিধানের কারণে ভারত ও চিনের নাম বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। দুই দেশই রাশিয়া থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে জ্বালানি আমদানি করে। ফলে বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার পর মার্কিন প্রশাসন কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, তার উপর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব পড়তে পারে। তবে এখনই ভারত বা চিনের উপর কোনও নতুন শুল্ক কার্যকর হয়নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভবিষ্যতে এই ক্ষমতা ব্যবহার করবেন কি না, তা এখনও নির্ভর করছে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের উপর।
রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই শব্দের মাধ্যমে সাধারণত এমন পুরনো তেলবাহী জাহাজের নেটওয়ার্ককে বোঝানো হয়, যেগুলির সাহায্যে রাশিয়া পশ্চিমী নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পাঠানোর চেষ্টা করে। নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় এই জাহাজগুলির মালিক, পরিচালনাকারী সংস্থা এবং সহযোগী আর্থিক নেটওয়ার্কগুলিকে টার্গেট করা হতে পারে।
এছাড়াও রাশিয়ার সামরিক শিল্প, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্যকারী তৃতীয় দেশের সংস্থাগুলির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিলের আরও একটি অংশে ইরানের বিরুদ্ধে চলা কিছু আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাউসে বিলটি পাশ হলেও ভোটাভুটিতে সম্পূর্ণ ঐকমত্য দেখা যায়নি। অধিকাংশ রিপাবলিকান সদস্য বিলের পক্ষে ভোট দিলেও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে মতভেদ ছিল। ৫৮ জন ডেমোক্র্যাট সদস্য বিলের সমর্থনে ভোট দেন। অন্যদিকে ১৫২ জন ডেমোক্র্যাট সদস্য এর বিরোধিতা করেন। তাঁদের আপত্তির মূল কারণ ছিল প্রেসিডেন্টের হাতে অতিরিক্ত ট্যারিফ ক্ষমতা তুলে দেওয়া। বিরোধী সদস্যদের বক্তব্য, এই ক্ষমতা ভবিষ্যতে আমেরিকার মিত্র দেশগুলির বিরুদ্ধেও ব্যবহার করা হতে পারে।
বিলের সমালোচকরা আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হলে আমেরিকার সাধারণ মানুষের উপরও তার প্রভাব পড়তে পারে। আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে চাপ তৈরি করতে গিয়ে মার্কিন অর্থনীতি ও ভোক্তাদের উপর পরোক্ষ চাপ পড়তে পারে বলে তাঁদের দাবি।
অন্যদিকে, বিলের সমর্থকদের বক্তব্য, রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতিকে দুর্বল করতে হলে শুধু রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই হবে না। যে দেশগুলি রাশিয়ার জ্বালানি কিনছে বা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করছে, তাদের উপরও চাপ তৈরি করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, এই বিলের মাধ্যমে রাশিয়ার আয়ের প্রধান উৎসগুলির উপর আঘাত হানার চেষ্টা করা হয়েছে।
এর আগে মার্কিন সেনেট ৮৬-১১ ভোটে বিলটি পাশ করেছিল। সেনেটের পর হাউসেও বিল অনুমোদিত হওয়ায় এখন তা প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে। ট্রাম্প বিলটিতে স্বাক্ষর করলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা কাঠামো আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্য, ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক, চিন-মার্কিন বাণিজ্য এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনৈতিক সমীকরণেও নতুন প্রভাব পড়তে পারে।
এখন নজর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। তিনি দ্রুত বিলটিতে স্বাক্ষর করেন কি না, এবং স্বাক্ষরের পর কোন দেশ বা সংস্থার বিরুদ্ধে নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে বিল পাশ হওয়া এবং বাস্তবে শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই আগামী দিনে মার্কিন প্রশাসনের নির্দেশ ও বাস্তব পদক্ষেপের উপরই পরিস্থিতির পরবর্তী দিক নির্ভর করবে।


