পাকিস্তানভিত্তিক কুখ্যাত গ্যাংস্টার শাহজাদ ভাট্টিকে ঘিরে তৈরি হওয়া নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে বড় পদক্ষেপ নিল কেন্দ্রীয় সরকার। বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ‘শাহজাদ ভাট্টি নেটওয়ার্ক’ বা SBN-কে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন, অর্থাৎ UAPA-এর আওতায় সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংগঠনটিকে UAPA-র প্রথম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে এখন থেকে এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও সংগঠনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, শাহজাদ ভাট্টি নেটওয়ার্ক সীমান্তপারের অস্ত্র, বিস্ফোরক এবং মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি, এই নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে তরুণ ও স্থানীয় অপরাধীদের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে যুক্ত করার অভিযোগও উঠেছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলির দাবি, সংগঠনটি বিভিন্ন অপরাধমূলক নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে ভারতে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের পরিকাঠামো তৈরির চেষ্টা করছিল।
সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, শাহজাদ ভাট্টি নেটওয়ার্ক দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংগঠনটির বিরুদ্ধে ডিজিটাল মাধ্যমে উস্কানিমূলক ও বিদ্বেষমূলক বিষয়বস্তু ছড়ানোর অভিযোগও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে যুবসমাজকে প্রভাবিত করা এবং সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের জন্য নিয়োগের চেষ্টা করা হয়েছিল কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্তের আগে দেশজুড়ে শাহজাদ ভাট্টি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে বড়সড় অভিযান চালানো হয়েছিল। স্বাধীনতা দিবসের আগে নিরাপত্তা সংস্থাগুলি একযোগে অভিযান চালিয়ে ১৪টি রাজ্য থেকে ২৫৩ জনকে গ্রেপ্তার বা আটক করে বলে সরকারি সূত্রে জানা যায়। এই অভিযানের সঙ্গে ৮০টিরও বেশি এফআইআর দায়ের করা হয়েছিল। অস্ত্র, গ্রেনেড, বিস্ফোরক, কার্তুজ এবং অন্যান্য সন্দেহজনক সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে বলেও তদন্তকারী সংস্থাগুলির তরফে দাবি করা হয়।
কেন্দ্রের অভিযোগ, শাহজাদ ভাট্টি নেটওয়ার্ক শুধুমাত্র একটি অপরাধী গোষ্ঠী নয়। বরং সীমান্তপারের মদতে অপরাধী ও স্থানীয় যুবকদের ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চালানোর একটি সংগঠিত কাঠামো হিসেবে কাজ করছিল। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অস্ত্র ও বিস্ফোরক পাচার, মাদক সরবরাহ, নজরদারি এবং হামলার পরিকল্পনার মতো কাজ করা হত বলে অভিযোগ। তবে এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা আদালত ও তদন্তের পরবর্তী ধাপে প্রমাণিত হবে।
শাহজাদ ভাট্টির বিরুদ্ধে ভারত-সহ একাধিক দেশে অপরাধমূলক কার্যকলাপের অভিযোগ রয়েছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলির দাবি, তিনি পাকিস্তান ও দুবাইকে কেন্দ্র করে নিজের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা ভারতের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় যোগাযোগ তৈরি করেছিল বলে অভিযোগ। এই যোগাযোগের মাধ্যমে অপরাধী চক্রের সদস্যদের কাজে লাগানো এবং সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সংগঠনটি তরুণ ও ছোটখাটো অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রভাবিত করে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডে নামানোর চেষ্টা করছিল। এই ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া রুখতে নিরাপত্তা সংস্থাগুলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের উপর নজরদারি বাড়িয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ ও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করেও অভিযান চালানো হচ্ছে।
কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তের ফলে শাহজাদ ভাট্টি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে তদন্ত আরও বিস্তৃত হতে পারে। সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত সম্পত্তি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, আর্থিক লেনদেন এবং যোগাযোগের নেটওয়ার্ক খতিয়ে দেখা হবে। সন্ত্রাসে অর্থ জোগান, ষড়যন্ত্র, বেআইনি অস্ত্র রাখা এবং বিস্ফোরক আইনের মতো বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়েরের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা তদন্তের তথ্যের উপর নির্ভর করবে।
এই ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন রাজ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হতে পারে। বিশেষ করে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে সন্দেহজনক যোগাযোগ ও অপরাধী নেটওয়ার্কের উপর নজরদারি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, সাম্প্রতিক অভিযানে এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে বলে তদন্তকারী সংস্থাগুলির দাবি।
কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সন্ত্রাসবাদ ও সীমান্তপারের অপরাধের বিরুদ্ধে কোনও রকম আপস করা হবে না। শাহজাদ ভাট্টি নেটওয়ার্ককে নিষিদ্ধ সংগঠনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত সেই কঠোর নীতির অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সংগঠনটির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং বিদেশি যোগাযোগের বিষয়গুলি এখনও তদন্তাধীন।
এখন নজর থাকবে পরবর্তী তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের দিকে। শাহজাদ ভাট্টি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত আরও কতজনের সন্ধান পাওয়া যায়, সংগঠনের আর্থিক উৎস কোথায় এবং ভারতে তাদের কী ধরনের কার্যকলাপ ছিল—এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলি। কেন্দ্রের এই ঘোষণার পর নেটওয়ার্কটির বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


