এশিয়ান গেমসে ইতিহাস তৈরি করেও সোনার লড়াই থেকে ছিটকে গেলেন ভারতের MMA তারকা সূচিকা তারিয়াল। মাত্র ৭০০ গ্রাম ওজনের ব্যবধান শেষ পর্যন্ত তাঁর ফাইনালে ওঠার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল। তবে হতাশার মধ্যেও ভারতের ক্রীড়াক্ষেত্রে নতুন ইতিহাস লিখেছেন ৩৬ বছরের এই ভারতীয় ফাইটার। এশিয়ান গেমসে মিক্সড মার্শাল আর্টসে ভারতের প্রথম পদকজয়ী হিসেবে নাম উঠে গেল সূচিকার। মহিলাদের ট্র্যাডিশনাল ৬০ কেজি বিভাগে ব্রোঞ্জ জিতে নজির গড়েছেন তিনি।
সোমবার সেমিফাইনালে সিঙ্গাপুরের হুই হুন তেও-এর মুখোমুখি হন সূচিকা। শুরু থেকেই লড়াই ছিল অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি। প্রথম রাউন্ডে তেও বক্সিংয়ের মাধ্যমে কিছুটা এগিয়ে গেলেও দ্বিতীয় রাউন্ডে নিজের জুডো দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ম্যাচে ফিরে আসেন ভারতীয় প্রতিযোগী। গ্র্যাপলিং এবং টেকডাউনে বেশ কয়েকবার প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলেন তিনি। নির্ধারিত সময়ের পরও দুই যোদ্ধার মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়নি। ফলে লড়াই গড়ায় এক মিনিটের অতিরিক্ত সময়ে।
ওভারটাইমেও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। দুই প্রতিযোগীই নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে রেফারির সিদ্ধান্ত যায় সিঙ্গাপুরের হুই হুন তেও-এর পক্ষে। এই সিদ্ধান্তে স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়েন সূচিকা এবং ভারতীয় শিবির। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর সূচিকাকে আবেগপ্রবণ অবস্থায় দেখা যায়। এমনকি পুরস্কার মঞ্চের আনুষ্ঠানিকতার সময়ও তিনি অত্যন্ত হতাশ ছিলেন।
তবে এখানেই শেষ হয়নি ম্যাচের নাটকীয়তা। প্রাথমিক সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে ভারতীয় শিবির। রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতীয় MMA ফেডারেশন নির্ধারিত ১,০০০ মার্কিন ডলার ফি দিয়ে রিভিউয়ের আবেদন করে। এরপর লড়াইয়ের ভিডিও ফুটেজ খতিয়ে দেখে একটি বিশেষ প্যানেল। পর্যালোচনার পরে প্রাথমিক ফলাফল বদলে দেওয়া হয় এবং ম্যাচটিকে ড্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ রিভিউয়ের পরে সরাসরি তেও-কে জয়ী ঘোষণা করা হয়নি।
এরপর সামনে আসে প্রতিযোগিতার টাই-ব্রেকিং নিয়ম। লড়াই ড্র হলে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী বিজয়ী নির্ধারণের ব্যবস্থা রয়েছে। সতর্কবার্তার হিসাবেও দুই প্রতিযোগীর মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়নি। তখন সকালের অফিসিয়াল ওজন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেখানেই সূচিকার ভাগ্য বদলে যায়। দেখা যায়, তেও-এর ওজন সূচিকার তুলনায় প্রায় ৭০০ গ্রাম কম। সেই ওজনের পার্থক্যের ভিত্তিতে ‘break tie by weight’ নিয়ম প্রয়োগ করা হয়। ফলে ফাইনালে যাওয়ার সুযোগ পান সিঙ্গাপুরের প্রতিযোগী, আর সূচিকাকে ব্রোঞ্জ পদক নিয়েই থামতে হয়।
এই ফলাফলটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমসে প্রথমবারের মতো মিক্সড মার্শাল আর্টস অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আর সেই প্রথম আসরেই ভারতের হয়ে প্রথম MMA পদক এনে দিলেন সূচিকা। ফলে ফাইনালে উঠতে না পারলেও তাঁর ব্রোঞ্জ পদক ভারতীয় MMA-র ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকল। আন্তর্জাতিক রিপোর্টগুলিও তাঁকে ভারতের প্রথম Asian Games MMA medallist হিসেবে উল্লেখ করেছে।
সূচিকার ক্রীড়াজীবনও যথেষ্ট বৈচিত্র্যময়। হরিয়ানার এই ৩৬ বছরের অ্যাথলিট ছোটবেলা থেকেই কমব্যাট স্পোর্টসের সঙ্গে যুক্ত। মাত্র ১২ বছর বয়সে আত্মরক্ষার প্রয়োজন থেকে লড়াইয়ের প্রশিক্ষণ শুরু করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে জুডো-সহ একাধিক কমব্যাট স্পোর্টসে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। ২০২২ সালের কমনওয়েলথ গেমসেও জুডোয় ভারতের হয়ে অংশ নিয়েছিলেন এবং ২০২৩ সালের এশিয়ান গেমসে কুরাশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
এশিয়ান গেমসে তাঁর এই পারফরম্যান্স তাই শুধুমাত্র একটি ব্রোঞ্জ পদক জয়ের ঘটনা নয়। একই সঙ্গে এটি ভারতীয় MMA-র আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার পর মাত্র ৭০০ গ্রাম ওজনের কারণে সেই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় হতাশা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু দিনের শেষে সূচিকার নামই লেখা থাকবে ভারতের প্রথম Asian Games MMA medal winner হিসেবে।
ওজনের কারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় ফল বদলে যাওয়ার ঘটনা ভারতীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে নতুন নয়। ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকে কুস্তিগির ভিনেশ ফোগাটের ক্ষেত্রে ওজনসংক্রান্ত নিয়মের কারণে ফাইনালে ওঠার পরও তাঁকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়তে হয়েছিল। সূচিকার ঘটনা অবশ্য আলাদা—এখানে তাঁর পদক হাতছাড়া হয়নি; বরং ঐতিহাসিক ব্রোঞ্জ নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু ফাইনালে ওঠার সুযোগটি ৭০০ গ্রাম ওজনের ব্যবধানে হারিয়ে যাওয়ায় সেই ঘটনার সঙ্গে ভিনেশের ঘটনাটির তুলনা টানা হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে।
তবে এই হতাশার মধ্যেও সূচিকার কৃতিত্ব কমছে না। এশিয়ান গেমসের মঞ্চে নতুন একটি খেলায় ভারতের প্রথম পদক এনে দেওয়া নিজেই একটি বড় সাফল্য। সেমিফাইনালের ফল নিয়ে ভারতীয় শিবিরের আপিল, পর্যালোচনার পরে ড্র ঘোষণা এবং শেষ পর্যন্ত ওজনের নিয়মে প্রতিপক্ষের ফাইনালে যাওয়া—পুরো ঘটনাই সূচিকার এশিয়াড অভিযানকে নাটকীয় করে তুলেছে। সোনা বা রুপোর বদলে ব্রোঞ্জ এলেও ভারতের MMA ইতিহাসে সূচিকা তারিয়ালের নাম স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিল।


