সন্ত্রাসবাদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় পাকিস্তানের শীর্ষে উঠে আসার দাবি ঘিরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (IEP)-এর প্রকাশিত Global Terrorism Index 2026-এর তথ্য সামনে আসার পর পাকিস্তানের প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হুসেন হাক্কানি ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নীতির কড়া সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, “ঘরে সাপ পুষলে একদিন সেই সাপ নিজের বাড়ির মানুষকেই কামড়ায়।” তাঁর এই মন্তব্য পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদবিরোধী নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জঙ্গি হামলার সংখ্যা, হতাহত, অপহরণ এবং সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির নিরিখে পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত দেশ হিসেবে উঠে এসেছে। এই তথ্য সামনে আসতেই সামাজিক মাধ্যমে আইইপি-র তালিকা শেয়ার করে আত্মসমালোচনামূলক মন্তব্য করেন হুসেন হাক্কানি।
### হাক্কানির বিস্ফোরক মন্তব্য
সোশ্যাল মিডিয়ায় হাক্কানি লেখেন, “নিজের বাড়ির পিছনে সাপ রাখলে এটাই হয়। ৫০ বছর আগে কট্টরপন্থী জেহাদিদের অস্ত্র দেওয়া হয়েছিল। আজ পাকিস্তানই সেই নীতির সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে।”
তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল, অতীতে রাষ্ট্রের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তের ফলে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলির বিকাশ ঘটেছিল এবং পরবর্তীতে সেই গোষ্ঠীগুলির একাংশই দেশের অভ্যন্তরে বড় নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে।
### “ভালো জঙ্গি, খারাপ জঙ্গি” নীতির সমালোচনা
হাক্কানির মতে, পাকিস্তানের অন্যতম বড় ভুল ছিল বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি সংগঠনগুলিকে আলাদা চোখে দেখা। তিনি বলেন, “ভালো জঙ্গি” ও “খারাপ জঙ্গি” বলে বিভাজন করার নীতি শেষ পর্যন্ত দেশের নিরাপত্তাকে আরও দুর্বল করেছে।
তাঁর দাবি, নির্বাচিতভাবে কিছু গোষ্ঠীকে সহনশীলতা দেখানো, আবার অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর নীতিই বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ।
### রিপোর্টে কী বলা হয়েছে?
Global Terrorism Index 2026 তৈরি করা হয়েছে কয়েকটি সূচকের ভিত্তিতে—
* জঙ্গি হামলার সংখ্যা
* নিহতের সংখ্যা
* আহতের সংখ্যা
* অপহরণের ঘটনা
* সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি
এই সূচকগুলির সমন্বিত মূল্যায়নের ভিত্তিতেই পাকিস্তানকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
### সাম্প্রতিক হামলায় বাড়ছে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ, বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়া এবং বেলুচিস্তানে ধারাবাহিক জঙ্গি হামলা হয়েছে। পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনী এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর একাধিক বড় হামলার ঘটনা ঘটেছে।
আফগানিস্তান সীমান্ত ঘেঁষা এলাকায় জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে পাকিস্তান সম্প্রতি সীমান্তপারের বিমান হামলাও চালায়। ইসলামাবাদের দাবি, সেই অভিযানে বহু জঙ্গি নিহত হয়েছে, যদিও আফগান তালিবান প্রশাসন বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ তুলেছে।
### জাতিসংঘে পাকিস্তানের অবস্থান
এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে গিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ কাশ্মীর প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তার একদিন পরই হাক্কানির এই মন্তব্য সামনে আসে, যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতি নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
### পাকিস্তানের সরকারি অবস্থান
অন্যদিকে পাকিস্তানের সরকারি প্রতিনিধিরা ধারাবাহিকভাবে দাবি করে আসছেন, দেশটি নিজেই সন্ত্রাসবাদের অন্যতম বড় শিকার। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও পাকিস্তানের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে হাজার হাজার পাকিস্তানি নাগরিক সন্ত্রাসবাদে প্রাণ হারিয়েছেন এবং সীমান্তপারের জঙ্গি তৎপরতা মোকাবিলায় সরকার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
### বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির সক্রিয়তা, আন্তঃসীমান্ত সংঘাত এবং দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নীতির জটিলতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কার, জঙ্গি সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো ছাড়া এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হবে না।
### আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা
হুসেন হাক্কানির আত্মসমালোচনামূলক মন্তব্য পাকিস্তানের নিরাপত্তা নীতিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে সরকারি অবস্থান বলছে পাকিস্তান নিজেই সন্ত্রাসবাদের বড় ভুক্তভোগী, অন্যদিকে প্রাক্তন কূটনীতিকের বক্তব্য অতীতের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলির পুনর্মূল্যায়নের প্রশ্ন তুলেছে। ফলে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।


