নদিয়ার রানাঘাট থেকে জাপানের নাগোয়া—প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটারের এই যাত্রা শুধু ভৌগোলিক দূরত্বের নয়, বরং দীর্ঘ ১৮ বছরের কঠোর পরিশ্রম, সংগ্রাম এবং অদম্য মানসিক শক্তির প্রতীক। ভারতীয় মহিলা কবাডি দলের হয়ে এশিয়ান গেমসে সোনার পদক জয়ের পর আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানালেন বাংলার মেয়ে পিংকি রায়। তিনি জানিয়েছেন, আজ যদি তাঁর বাবা-মা বেঁচে থাকতেন, তাহলে এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন তাঁরাই।
শনিবার নাগোয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসের মহিলা কবাডি ফাইনালে শক্তিশালী ইরানকে হারিয়ে ভারত সোনার পদক জেতে। সেই ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম সদস্য ছিলেন রানাঘাটের পিংকি রায়। দেশের জার্সিতে প্রথমবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেমেই এশিয়ান গেমসের মতো বড় প্রতিযোগিতায় সোনা জয় তাঁর কেরিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।
### স্কুলের মাঠ থেকে এশিয়াডের মঞ্চ
মাত্র ১৫ বছর বয়সে স্কুলের হয়ে কবাডি খেলতে শুরু করেছিলেন পিংকি। ছোট্ট শহরের মাটির মাঠ থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর স্বপ্নের পথচলা। এরপর ধীরে ধীরে রাজ্য দলের হয়ে সুযোগ পান, তারপর জাতীয় পর্যায়ে নিজের জায়গা তৈরি করেন। বহুবার জাতীয় শিবিরে ডাক পেলেও শেষ পর্যন্ত ভারতীয় দলে সুযোগ মেলেনি।
কখনও চোট, কখনও প্রতিযোগিতার কঠিন লড়াই—সব মিলিয়ে তাঁর পথ মোটেও সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। অবশেষে ৩৩ বছর বয়সে এসে ভারতীয় দলের চূড়ান্ত স্কোয়াডে সুযোগ পান। আর সেই সুযোগকেই সোনার পদকে রূপান্তরিত করেছেন তিনি।
### “সোনা জিতেই ফিরব ভেবেছিলাম”
ফাইনালের পর নাগোয়া থেকে হোয়াটসঅ্যাপ কলে নিজের অনুভূতি ভাগ করে নেন পিংকি। তাঁর কথায়, কবাডির জন্য এশিয়ান গেমসই সম্ভবত সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চ, কারণ এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের প্রায় সব শক্তিশালী দল অংশ নেয়।
তিনি জানান, ভারতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার দিন থেকেই নিজের কাছে একটাই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—সোনা জিতেই দেশে ফিরবেন। সেই লক্ষ্য পূরণ হওয়ায় তিনি অত্যন্ত গর্বিত এবং আবেগাপ্লুত।
### ইরানের বিরুদ্ধে কঠিন ফাইনাল
গ্রুপ পর্বে ভারত ইরানকে ৩৭-২৩ ব্যবধানে পরাজিত করেছিল। তবে ফাইনালে লড়াই ছিল অনেক বেশি কঠিন। ম্যাচের এক পর্যায়ে ইরান ভারতকে যথেষ্ট চাপে ফেলে দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতীয় দল নিজেদের অভিজ্ঞতা, রক্ষণভাগের দৃঢ়তা এবং আক্রমণের কার্যকর কৌশলের জোরে ম্যাচ নিজেদের দখলে নিয়ে সোনার পদক নিশ্চিত করে।
ভারতের মহিলা কবাডি দল গোটা প্রতিযোগিতাতেই দারুণ ছন্দে ছিল। বাংলাদেশকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে অভিযান শুরু করার পর ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তারা ফাইনালে পৌঁছায়।
### মা-বাবার স্মৃতিতে উৎসর্গ
সাফল্যের মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি মনে পড়েছে বাবা-মায়ের কথা। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছিলেন পিংকি। এরপর প্রায় নয় বছর আগে মা চণ্ডী রায়ও প্রয়াত হন।
তিনি বলেন, “বাবাকে খুব বেশি করে পাইনি। কিন্তু মা-ই ছিল আমাদের সব। মায়ের কঠোর পরিশ্রম আমাদের জীবন গড়ে দিয়েছে। আজ মা-বাবা থাকলে খুব খুশি হতেন।”
এই কথাগুলো বলতে গিয়েও আবেগে ভেঙে পড়েছিলেন বাংলার এই সোনাজয়ী ক্রীড়াবিদ।
### এবার লক্ষ্য বিশ্বকাপ
এশিয়ান গেমসে সোনা জয়ের পরও থেমে থাকতে চান না পিংকি। তিনি জানিয়েছেন, সম্ভবত আরও দু’বছর খেলতে পারবেন। তাই এই সময়ের মধ্যে যত বেশি সম্ভব আন্তর্জাতিক সাফল্য অর্জন করাই তাঁর লক্ষ্য।
আগামী বছরের এপ্রিলে সম্ভাব্য কবাডি বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করতে চান তিনি। তাঁর আশা, এশিয়াডের সোনার পর বিশ্বকাপেও দেশের জন্য সাফল্য এনে দিতে পারবেন।
### বাংলার ক্রীড়াজগতের গর্ব
পিংকি রায়ের এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং বাংলার ক্রীড়াজগতের জন্যও এক গর্বের মুহূর্ত। দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, ব্যর্থতার পর ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের হয়ে সোনা জয়—তাঁর এই যাত্রা নতুন প্রজন্মের ক্রীড়াবিদদের কাছে নিঃসন্দেহে এক বড় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।


