জাপানের আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসে ভারতের হয়ে ইতিহাস গড়লেন হিমাচল প্রদেশের দীর্ঘদূরত্বের দৌড়বিদ **সাওয়ান বারওয়াল**। পুরুষদের ম্যারাথনে দুরন্ত পারফরম্যান্স করে তিনি জিতে নিলেন রুপোর পদক। শুধু পদকই নয়, নিজের জাতীয় রেকর্ডও আরও উন্নত করলেন ২৮ বছর বয়সি এই অ্যাথলিট। তাঁর এই সাফল্য ভারতের পুরুষদের ম্যারাথনে ৪৪ বছরের দীর্ঘ পদক-খরারও অবসান ঘটিয়েছে।
ম্যারাথন শুরুর আগে সাওয়ানকে প্রায়ই শুনতে হত— ভারতীয়দের পক্ষে দুই ঘণ্টার কাছাকাছি সময়ে ম্যারাথন শেষ করা নাকি সম্ভব নয়। অনেকেই মনে করতেন আন্তর্জাতিক মানের ম্যারাথনে ভারতীয়রা পিছিয়েই থাকবেন। কিন্তু সেই সব সমালোচনাকে প্রেরণা বানিয়েই ট্র্যাকে নেমেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত নিজের পারফরম্যান্স দিয়েই সমস্ত সন্দেহের জবাব দিলেন এই সেনা-অ্যাথলিট।
এশিয়ান গেমসের ম্যারাথনে সাওয়ান দৌড় শেষ করেন **২ ঘণ্টা ১১ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে**। এই সময়টি তাঁর আগের জাতীয় রেকর্ডের চেয়েও দ্রুত। চলতি বছরের রটারড্যাম ম্যারাথনে তিনি ২ ঘণ্টা ১১ মিনিট ৫৮ সেকেন্ড সময় নিয়ে ভারতের ৪৮ বছরের পুরনো জাতীয় রেকর্ড ভেঙেছিলেন। এবার এশিয়াডের মঞ্চে সেই রেকর্ড আরও উন্নত করে নিজের নাম ইতিহাসে আরও উজ্জ্বল করে তুললেন।
এই প্রতিযোগিতায় সোনা জিতেছেন জাপানের **ইচিকাতা ইয়ামাশিতা**, যিনি দৌড় শেষ করেন ২ ঘণ্টা ১০ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে। ব্রোঞ্জ পান চীনের **পেইয়ো ফেং**, তাঁর সময় ছিল ২ ঘণ্টা ১২ মিনিট ১৩ সেকেন্ড। তবে সোনা হাতছাড়া হলেও সাওয়ানের লড়াই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছিল চোখে পড়ার মতো।
দৌড়ের মাঝের অংশে চীনের ফেং অনেকটা সময় এগিয়ে ছিলেন। প্রায় ১০ কিলোমিটার থেকে ৩৫ কিলোমিটার পর্যন্ত তিনিই নেতৃত্বে ছিলেন। কিন্তু ম্যারাথনের আসল পরীক্ষা শুরু হয় শেষ ভাগে। তখনই জাপানের ইয়ামাশিতা গতি বাড়ান এবং সাওয়ানও শেষ পর্যন্ত হাল না ছেড়ে লড়াই চালিয়ে যান। শেষ ৭.১৪৫ কিলোমিটার তিনি মাত্র ২২ মিনিট ১৩ সেকেন্ডে শেষ করেন, যা তাঁর অসাধারণ ফিনিশিং ক্ষমতার প্রমাণ।
পদক জয়ের পর ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দেশের কথাই আগে বলেছেন সাওয়ান। তাঁর কথায়, “এটা ভারতের জন্য। এই পদকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শেষদিকে জাপানি অ্যাথলিট এগিয়ে গিয়েছিল, আমিও শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছি।” তাঁর এই মন্তব্যে দেশের প্রতি গর্ব এবং লড়াইয়ের মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সাওয়ানের এই রুপো শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের জন্যও একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। পুরুষদের ম্যারাথনে শেষবার ভারত পদক জিতেছিল **১৯৮২ সালের দিল্লি এশিয়ান গেমসে**, যখন হোসুর কুক্কাপ্পা সীতারাম ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন। এরপর টানা ৪৪ বছর কোনও ভারতীয় পুরুষ ম্যারাথনে এশিয়াড পদক পাননি। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটালেন হিমাচলের এই দৌড়বিদ।
হিমাচল প্রদেশের মান্ডি জেলার ছেলে সাওয়ানের দৌড়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল স্কুলজীবনে। স্কুলের প্রতিযোগিতা থেকে জেলা, তারপর রাজ্য স্তরে ধীরে ধীরে নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন তিনি। ২০১৯ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর কেরিয়ারে নতুন মোড় আসে। প্রথমদিকে মূলত ট্র্যাক ইভেন্টেই অংশ নিতেন। তবে ২০২২ সালের এশিয়ান গেমসের সময় চোট এবং নানা সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার পর কোচ সুরেন্দর সিং তাঁকে ম্যারাথনে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। সেই সিদ্ধান্তই আজ তাঁর জীবনের অন্যতম বড় সাফল্যের পথ খুলে দিয়েছে।
ম্যারাথনের জন্য তাঁকে কান্নুর থেকে বেঙ্গালুরু পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় দীর্ঘ সময় ধরে প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। শুরুতে ৪২.১৯৫ কিলোমিটারের দৌড় তাঁর কাছে সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। নিজেই বলেছেন, ৫ বা ১০ কিলোমিটারের ক্লান্তি আর পূর্ণ ম্যারাথনের ক্লান্তির মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। সিনিয়রদের কাছ থেকে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছিলেন— “ম্যারাথন আসলে শুরু হয় ৩৫ কিলোমিটারের পরে।” সেই শিক্ষা এশিয়াডের মঞ্চে কাজে লেগেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সাওয়ানের এই সাফল্য ভারতীয় দীর্ঘদূরত্বের দৌড়ে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। বহুদিন ধরে আন্তর্জাতিক ম্যারাথনে ভারতীয়দের সামর্থ্য নিয়ে যে প্রশ্ন উঠত, তাঁর পারফরম্যান্স সেই ধারণাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। নিজের রেকর্ড ভেঙে এশিয়াডে রুপো জিতে তিনি শুধু ইতিহাসই গড়েননি, ভবিষ্যতের ভারতীয় ম্যারাথন দৌড়বিদদের জন্যও অনুপ্রেরণার নতুন অধ্যায় লিখেছেন।
—


