এশিয়ান গেমস ২০২৬-এ দ্বিতীয় দিনেই পদকের ঝুলি ভরতে শুরু করল ভারত। আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসের দ্বিতীয় দিনে মোট চারটি পদক জিতেছে ভারতীয় অ্যাথলিটরা। এর মধ্যে তিনটি এসেছে শুটিং থেকে, আর একটি পদক এসেছে মিক্সড মার্শাল আর্টস বা MMA থেকে। তবে এত সাফল্যের পরেও অধরা রয়ে গেল সোনার পদক। দিনের শেষে ভারতের মোট পদকসংখ্যা দাঁড়ায় ছয়ে—চারটি রুপো এবং দুটি ব্রোঞ্জ।
দ্বিতীয় দিনের সবচেয়ে বড় সাফল্য নিঃসন্দেহে শুটিংয়ে। পুরুষদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের ব্যক্তিগত বিভাগে জোড়া পদক জিতে নিয়েছেন ভারতের হিমাংশু ধিল্লোঁ এবং রুদ্রাঙ্ক্ষ পাটিল। হিমাংশু রুপোর পদক জিতেছেন, আর রুদ্রাঙ্ক্ষ পেয়েছেন ব্রোঞ্জ। একই ইভেন্টের দলগত বিভাগেও ভারত রুপো জিতেছে। ফলে একদিনেই শুটিং থেকে ভারতের ঝুলিতে এসেছে তিনটি পদক। এই পারফরম্যান্সের ফলে শুটিং ফের এশিয়ান গেমসে ভারতের অন্যতম শক্তিশালী পদকের উৎস হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করেছে।
১০ মিটার এয়ার রাইফেলের ব্যক্তিগত ফাইনালে শুরু থেকেই নজর ছিল দুই ভারতীয় শুটারের দিকে। হিমাংশু ধিল্লোঁ এবং রুদ্রাঙ্ক্ষ পাটিল দুজনেই দুর্দান্তভাবে প্রতিযোগিতা শুরু করেন। একটা সময় পর্যন্ত দুজনের মধ্যেই সোনার লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত চিনের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন শেং লিহাও অসাধারণ পারফরম্যান্স করে সোনা দখল করেন। শেং ২৫৪.২ পয়েন্ট নিয়ে এশিয়ান গেমসের নতুন রেকর্ডও গড়েন। হিমাংশু ২৫২.৪ পয়েন্ট নিয়ে রুপো এবং রুদ্রাঙ্ক্ষ ২৩0.৯ পয়েন্ট নিয়ে ব্রোঞ্জ জেতেন।
হিমাংশুর জন্য এই রুপোর পদক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এশিয়ান গেমসে তাঁর অভিষেকেই ব্যক্তিগত বিভাগে রুপো জয় নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। মাত্র ২০ বছর বয়সি এই শুটারের সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ অনুশীলন এবং পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। জানা গিয়েছে, শুটিংয়ে আসার আগে তিনি অল্প সময়ের জন্য কুস্তির প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। পরে শুটিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। তাঁর প্রতিভায় আস্থা রেখে পরিবার একটি দামি রাইফেল কেনার জন্য প্রায় ৩ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করেছিল। সেই সিদ্ধান্তের সুফল মিলল এশিয়ান গেমসের মঞ্চে।
অন্যদিকে রুদ্রাঙ্ক্ষ পাটিলের কাছেও এই ব্রোঞ্জ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে তিনি আন্তর্জাতিক স্তরে ইতিমধ্যেই নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন। বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জেতা এই ভারতীয় শুটার এবার এশিয়ান গেমসেও পদক জিতলেন। ফাইনালে তাঁর লড়াই ছিল অত্যন্ত কঠিন। শুরুতে তিনি একাধিকবার শীর্ষস্থানে উঠে এসেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিনের শেং লিহাও এবং সতীর্থ হিমাংশুর সঙ্গে লড়াইয়ে ব্রোঞ্জ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাঁকে।
ব্যক্তিগত বিভাগের পাশাপাশি পুরুষদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের দলগত বিভাগেও ভারতের সাফল্য আসে। হিমাংশু ধিল্লোঁ এবং রুদ্রাঙ্ক্ষ পাটিল এই দলগত পদক জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ফলে একই দিনে দুই ভারতীয় শুটারের ঝুলিতে দুটি করে পদক আসে। এই সাফল্য ভারতীয় শুটিং দলের গভীরতা এবং ধারাবাহিকতার প্রমাণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
তবে দ্বিতীয় দিনের আরেকটি বড় খবর এসেছে MMA থেকে। মিক্সড মার্শাল আর্টস এবারই প্রথমবার এশিয়ান গেমসের মূল প্রতিযোগিতায় জায়গা পেয়েছে। আর সেই নতুন খেলাতেই ভারতের হয়ে ইতিহাস লিখেছেন সূচিকা তারিয়াল। মহিলাদের ৬০ কেজি বিভাগে ব্রোঞ্জ জিতে তিনি এশিয়ান গেমসে ভারতের প্রথম MMA পদকজয়ী হয়ে উঠেছেন। ফলে তাঁর ব্রোঞ্জের গুরুত্ব শুধুমাত্র একটি পদক জয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভারতীয় MMA-র ইতিহাসেও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
সূচিকার সেমিফাইনাল ঘিরে অবশ্য তৈরি হয়েছিল যথেষ্ট নাটকীয়তা। সিঙ্গাপুরের প্রতিদ্বন্দ্বী হুই হুন তেও-এর বিরুদ্ধে নির্ধারিত সময়ের লড়াইয়ের পর ফলাফল নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ভারতীয় শিবির রিভিউয়ের আবেদন করে। পরে ফলাফল ড্র হিসেবে বিবেচিত হলে টাই-ব্রেকের নিয়ম কার্যকর হয়। শেষ পর্যন্ত ওজনের ব্যবধানের কারণে ভারতীয় ফাইটার ফাইনালে উঠতে পারেননি। মাত্র ৭০০ গ্রাম ওজনের ব্যবধান তাঁর সোনার লড়াইয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত করে ইতিহাস তৈরি করেন তিনি।
এশিয়ান গেমসে MMA-র অভিষেকের দিনেই ভারতের হয়ে পদক জেতায় সূচিকার কৃতিত্ব আরও বেড়ে যায়। তাঁর এই সাফল্য ভবিষ্যতে ভারতে MMA-কে আরও জনপ্রিয় করে তুলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। শুটিংয়ের পাশাপাশি নতুন একটি খেলায় ভারতের পদক আসা দেশের সামগ্রিক ক্রীড়াক্ষেত্রের জন্যও ইতিবাচক বার্তা।
দ্বিতীয় দিনের শেষে ভারতের মোট পদক দাঁড়িয়েছে ছয়ে। তার মধ্যে চারটি রুপো এবং দুটি ব্রোঞ্জ। এখনও পর্যন্ত সোনা না এলেও ভারতীয় শিবিরের পারফরম্যান্স নিয়ে হতাশ হওয়ার কোনও কারণ নেই। প্রথম দুই দিনে শুটিংয়ে ধারাবাহিক সাফল্য এসেছে এবং MMA-তে ঐতিহাসিক পদক পাওয়া গিয়েছে। ফলে সামনে থাকা প্রতিযোগিতাগুলিতে আরও পদক আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ভারতের জন্য সামনে রয়েছে আরও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট। বক্সিং, হকি, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, অ্যাথলেটিক্স-সহ বিভিন্ন খেলায় ভারতীয় অ্যাথলিটরা পদকের দাবিদার। বিশেষ করে দলগত খেলাগুলিতে ভারতের শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। ক্রিকেটেও ভারতের পদকের বড় আশা রয়েছে। ফলে দ্বিতীয় দিনের চার পদককে সামনে রেখে ভারতীয় শিবির এখন আরও বড় সাফল্যের অপেক্ষায়।
২০২২ সালের হ্যাংঝৌ এশিয়ান গেমসে ভারত ঐতিহাসিকভাবে ১০০-র বেশি পদক জিতেছিল। এবারও সেই সাফল্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এশিয়ান গেমসে এসেছে ভারত। তবে প্রতিযোগিতার শুরুতেই বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক হাতছাড়া হয়েছে। সোনার অপেক্ষা থাকলেও রুপো ও ব্রোঞ্জের ধারাবাহিকতা আশাব্যঞ্জক। ভারতের লক্ষ্য যে শুধু পদক জেতা নয়, বরং শীর্ষ দেশগুলির সঙ্গে ব্যবধান কমানো, তা এবারের প্রস্তুতিতেও স্পষ্ট।
এদিকে পদক তালিকায় চিন এখনও অনেকটাই এগিয়ে। দ্বিতীয় দিনেও চিন একাধিক সোনা জিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। শুটিং এবং সাঁতারে চিনের আধিপত্য বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। মাত্র ১৩ বছর বয়সি চিনা সাঁতারু ইউ জিদি ইতিমধ্যেই একাধিক সোনা জিতে নজর কেড়েছেন। ফলে পদক তালিকায় চিনের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া ভারতের পক্ষে কঠিন হলেও নিজেদের লক্ষ্যে ভারতীয় অ্যাথলিটরা এগিয়ে চলেছেন।
সব মিলিয়ে এশিয়ান গেমসের দ্বিতীয় দিন ভারতীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য ছিল পদকে ভরা। একদিকে হিমাংশু ধিল্লোঁর রুপো, রুদ্রাঙ্ক্ষ পাটিলের ব্রোঞ্জ এবং শুটিংয়ের দলগত রুপো, অন্যদিকে সূচিকা তারিয়ালের ঐতিহাসিক MMA ব্রোঞ্জ—একদিনে চার পদকই ভারতকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। এখন একটাই অপেক্ষা—কবে আসবে বহু প্রতীক্ষিত প্রথম সোনা? সামনে এখনও দীর্ঘ প্রতিযোগিতা বাকি। তাই ভারতীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের আশা, পরবর্তী দিনগুলিতে পদকের পাশাপাশি সোনার ঝুলিও খুলবে।


