ক্রিকেটকে নতুন দেশে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগে মুগ্ধ কিংবদন্তি ভারতীয় ক্রিকেটার শচীন তেণ্ডুলকর। ভারত ও জাপানের মধ্যে ঐতিহাসিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ ঘিরে জাপানের আয়োজকদের অভিনব উদ্যোগ প্রশংসা কুড়িয়েছে তাঁর। জাপানের সানো ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট গ্রাউন্ডে উপস্থিত দর্শকদের হাতে ম্যাচ শুরুর আগে তুলে দেওয়া হয়েছিল বিশেষ ‘ক্রিকেট গাইড’। জাপানি ভাষায় তৈরি সেই নির্দেশিকায় ক্রিকেটের মৌলিক নিয়ম, মাঠের বিন্যাস, রান পাওয়ার পদ্ধতি এবং উইকেট নেওয়ার বিভিন্ন কৌশল ছবি-সহ ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। ক্রিকেট সম্পর্কে যাঁদের খুব বেশি ধারণা নেই, তাঁদের খেলা বুঝতে সাহায্য করাই ছিল এই উদ্যোগের লক্ষ্য। এই ব্যবস্থাই শচীনের নজর কেড়েছে।
ভারতীয়দের কাছে ক্রিকেট অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও বিশ্বের বহু দেশে এখনও এই খেলা পরিচিত নয়। জাপানেও দীর্ঘদিন ধরে বেসবলই ছিল অন্যতম জনপ্রিয় ব্যাট-বল খেলা। ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক পরিসরে জাপানের উপস্থিতি থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এই খেলার নিয়মকানুন সম্পর্কে সচেতনতা তুলনামূলকভাবে কম। সেই কারণেই ভারতীয় দলের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ম্যাচকে শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখে ক্রিকেটের প্রচারের সুযোগ হিসেবেও ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন আয়োজকরা।
ভারত ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত হয়েছিল এই বিশেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। ম্যাচটি ঘিরে জাপানে বসবাসকারী ভারতীয়দের পাশাপাশি স্থানীয় দর্শকদের মধ্যেও যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি হয়। অনেক দর্শক প্রথমবার মাঠে বসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দেখার সুযোগ পান। কিন্তু ক্রিকেটের নিয়ম সম্পর্কে অনভিজ্ঞ দর্শকদের কাছে ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত সহজে বোঝা কঠিন হতে পারে। তাই দর্শকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সহজ ভাষায় তৈরি একটি নির্দেশিকা। সেখানে ক্রিকেটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছবি এবং সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
ওই গাইডে ফিল্ডারদের অবস্থান, চার ও ছয়ের পার্থক্য, রান সংগ্রহের নিয়ম, উইকেট পাওয়ার বিভিন্ন উপায় এবং আম্পায়ারদের ভূমিকা সম্পর্কে ব্যাখ্যা ছিল। ক্রিকেটের জটিল নিয়মকে সহজভাবে তুলে ধরার এই প্রয়াস নতুন দর্শকদের খেলার সঙ্গে পরিচিত হতে সাহায্য করে। মাঠে বসে খেলা দেখার সময় কোনও সিদ্ধান্ত বা ঘটনাকে বুঝতে সমস্যা হলে দর্শকেরা সেই নির্দেশিকা দেখে বিষয়টি বোঝার সুযোগ পান। ফলে ক্রিকেটকে স্থানীয় দর্শকদের কাছে আরও সহজবোধ্য করে তোলার চেষ্টা করা হয়।
এই উদ্যোগের ছবি নিজের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেন শচীন তেণ্ডুলকর। পোস্টে তিনি ক্রিকেটের নতুন দেশে নতুন দর্শক তৈরি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম ছিল, ক্রিকেট যখন নতুন জায়গায় নিজের জায়গা তৈরি করছে, তখন তা দেখা বিশেষ আনন্দের। ভারত ও জাপানের ম্যাচ নিজেই একটি আকর্ষণীয় ঘটনা হলেও দর্শকদের হাতে ক্রিকেট বোঝার জন্য নির্দেশিকা তুলে দেওয়ার বিষয়টি তাঁকে আরও বেশি আনন্দ দিয়েছে। কারণ প্রত্যেক ক্রিকেটপ্রেমীরই একদিন প্রথমবার ক্রিকেট দেখার অভিজ্ঞতা থাকে। নতুন দর্শকেরাও সেই প্রথম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে খেলার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন—এই বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন শচীন।
শচীন আরও উল্লেখ করেন, জাপান যেভাবে ভারতের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তারও প্রশংসা প্রাপ্য। ম্যাচটি বৃষ্টির কারণে নির্ধারিত সময়ের তুলনায় দেরিতে শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত ওভারের ম্যাচে পরিণত হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও দর্শকদের উৎসাহে ঘাটতি দেখা যায়নি। মাঠে উপস্থিত সমর্থকেরা ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করেন। ক্রিকেট সম্পর্কে অনেকের প্রাথমিক ধারণা না থাকলেও তাঁরা খেলা দেখার আগ্রহ নিয়ে স্টেডিয়ামে হাজির হয়েছিলেন। এই বিষয়টি ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সম্ভাবনার দিকটিও সামনে নিয়ে আসে।
ভারতীয় দল এই ম্যাচে অল্প ব্যবধানে জয় পায়। বৃষ্টির কারণে ম্যাচটি মাত্র পাঁচ ওভারে নামিয়ে আনা হয়েছিল। প্রথমে ব্যাট করে ভারত সীমিত ওভারে ৩২ রান সংগ্রহ করে। ভারতীয় দলের ব্যাটিংয়ে অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ারের ১৬ রানের ইনিংস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। জবাবে জাপানও লড়াই চালিয়ে যায় এবং নির্ধারিত পাঁচ ওভারে ৩০ রান সংগ্রহ করে। শেষ পর্যন্ত ভারত মাত্র দুই রানে জয়লাভ করে। ফলাফল ভারতের পক্ষে গেলেও জাপানের লড়াই দর্শকদের নজর কেড়েছে।
এই ম্যাচটি জাপানের ক্রিকেটের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতের মতো শক্তিশালী ক্রিকেটীয় দেশের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ জাপানের ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিচিত মুখদের মাঠে দেখতে পাওয়ায় জাপানের সাধারণ মানুষ ক্রিকেট সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছেন। আয়োজকদের তৈরি করা নির্দেশিকা সেই আগ্রহকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর একটি উদ্যোগ।
ক্রিকেটকে নতুন দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করাই যথেষ্ট নয়। স্থানীয় দর্শকদের খেলার নিয়ম বোঝানো, শিশু ও তরুণদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করা, স্কুল পর্যায়ে ক্রিকেটের সঙ্গে পরিচয় করানো এবং স্থানীয় ক্রীড়া সংস্কৃতির সঙ্গে ক্রিকেটকে যুক্ত করা—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের এই উদ্যোগ সেই বৃহত্তর প্রচেষ্টারই একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দর্শকদের হাতে গাইড তুলে দেওয়ার মতো ছোট পদক্ষেপ নতুন দর্শকদের খেলার সঙ্গে যুক্ত করতে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।
শচীন তেণ্ডুলকরের প্রশংসা সেই উদ্যোগকে আরও আন্তর্জাতিক পরিচিতি দিয়েছে। ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা যেখানে আগে থেকেই প্রবল, সেখানে নতুন দর্শক তৈরি করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। কিন্তু জাপানের মতো দেশে ক্রিকেটের নিয়ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে সাধারণ মানুষকে পরিচিত করানো একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সানো স্টেডিয়ামের এই উদ্যোগ সেই প্রক্রিয়ায় একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। ভারত-জাপান ম্যাচের ফলাফলের পাশাপাশি দর্শকদের ক্রিকেট শেখানোর এই প্রয়াসও তাই আলোচনায় উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে, ভারত ও জাপানের ম্যাচ শুধু দুই দলের মাঠের লড়াই ছিল না; এটি ক্রিকেটকে নতুন দর্শক ও নতুন ভূগোলের সঙ্গে পরিচয় করানোর একটি সুযোগও হয়ে উঠেছিল। জাপানি ভাষায় তৈরি ক্রিকেট-গাইডের মাধ্যমে আয়োজকেরা দেখিয়েছেন, একটি খেলা জনপ্রিয় করতে দর্শকদের কাছে তার নিয়ম সহজ করে পৌঁছে দেওয়া কতটা জরুরি। শচীন তেণ্ডুলকরের প্রশংসা সেই উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতে জাপানে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা কতটা বাড়ে, তা সময়ই বলবে। তবে এই ম্যাচ এবং দর্শকদের হাতে তুলে দেওয়া নির্দেশিকা জাপানে ক্রিকেট-প্রচারের পথে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকল।


