মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের ধুলিয়ানে দুর্গাপুজো মানেই শুধু মহিষাসুরমর্দিনীর আরাধনা নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গঙ্গার ভাঙন থেকে জনপদকে রক্ষার এক শতাব্দীপ্রাচীন বিশ্বাস। এখানকার কাঞ্চনতলার রাধাবল্লভ রায় জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজো আজও এক অনন্য ঐতিহ্য বহন করে চলেছে, যেখানে দেবী দুর্গার সঙ্গে সমান গুরুত্বে পূজিত হন **মা গঙ্গা**। স্থানীয়দের বিশ্বাস, গঙ্গাকে তুষ্ট রাখতে পারলেই নদীভাঙনের প্রকোপ কমবে এবং জনপদ নিরাপদ থাকবে।
### ‘বাইশ পুতুলের পুজো’র অনন্য ঐতিহ্য
এই জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজো এলাকাজুড়ে **‘বাইশ পুতুলের পুজো’** নামে পরিচিত। কারণ এখানে শুধু দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ নন, সব মিলিয়ে মোট **২২টি দেবদেবীর প্রতিমা** একসঙ্গে পূজিত হন।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হল প্রতিমার বিন্যাস। এখানে দেবী দুর্গার মাথার উপরে বিরাজ করেন শিব, আর শিবের মাথার উপরে থাকেন মা গঙ্গা। দেবীর দুই পাশে জয়া ও বিজয়া, অন্যদিকে কার্তিক ও গণেশ, পাশাপাশি রাম-সীতাসহ আরও একাধিক দেবদেবীর উপস্থিতি এই প্রতিমাকে বাংলার প্রচলিত একচালা দুর্গামূর্তির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে তুলেছে।
### নদীভাঙন রোধের প্রার্থনায় গঙ্গার আরাধনা
সামশেরগঞ্জ ও ধুলিয়ান দীর্ঘদিন ধরেই গঙ্গার ভাঙনের সমস্যায় জর্জরিত। বহু গ্রাম, চাষের জমি এবং বসতভিটে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই এই জমিদারবাড়ির পুজোয় মা গঙ্গার বিশেষ আরাধনার প্রচলন হয়েছে বলে স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন।
প্রতিবছর দেবীর সামনে প্রার্থনা করা হয়, যেন নতুন করে আর কোনও এলাকা নদীতে তলিয়ে না যায়। ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে প্রকৃতির প্রতি মানুষের নির্ভরশীলতার এই মেলবন্ধনই এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
### দুই শতাব্দীরও বেশি পুরনো ইতিহাস
প্রায় **২১৫ বছর আগে** জমিদার **রায়চন্দ্র রায়** এই পুজোর সূচনা করেন। সেই সময় দেড়শো বিঘা জমি দেবোত্তর হিসেবে দান করে পুজোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয়, এত বছর পরেও এখানে প্রতি বছর নতুন প্রতিমার কাঠামো তৈরি হয় না। বরং পুরনো কাঠামোকেই সংরক্ষণ করে তার উপর নতুন করে মাটির প্রলেপ দিয়ে প্রতিমা গড়ে তোলা হয়।
এই রীতি শুধু ঐতিহ্য রক্ষার জন্য নয়, বরং পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়।
### মহালয়ার আগেই শুরু হয় বোধন
বাংলার অধিকাংশ দুর্গাপুজোয় মহালয়ার দিন দেবীর আগমন ঘোষণা হলেও, এই জমিদারবাড়িতে **মহালয়ার আগেই দেবীর বোধন** সম্পন্ন হয়। প্রাচীন পারিবারিক নিয়ম অনুযায়ী বহু আচার আগেভাগেই শুরু হয়ে যায়।
ভোগের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষত্ব। দেবীর জন্য লুচি, বিভিন্ন ধরনের ভাজা এবং মিষ্টি নিবেদন করা হয়, যার প্রতিটি পদই **নুন ছাড়া** প্রস্তুত করা হয়। বহু প্রজন্ম ধরে একই নিয়ম আজও অক্ষরে অক্ষরে পালন করে আসছেন পরিবারের সদস্যরা।
### নবমীর ফুটবল, দশমীর বাইচ প্রতিযোগিতা
এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ নবমীর বিশেষ ফুটবল প্রতিযোগিতা। তবে এই খেলায় অংশগ্রহণের অধিকার শুধুমাত্র জমিদারবাড়ির পরিবারের পুত্রদের। বাইরের কেউ এই প্রতিযোগিতায় খেলতে পারেন না।
দশমীর দিন জমিদারবাড়ির মহিলারা ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলায় অংশ নেন। সেই সময় বাড়ির প্রধান প্রবেশদ্বার বহিরাগতদের জন্য বন্ধ রাখা হয়, যাতে পারিবারিক রীতি নির্বিঘ্নে পালন করা যায়।
### কাঁধে প্রতিমা, গঙ্গার ঘাটে শোভাযাত্রা
বিজয়ার দিন প্রতিমা ট্রাকে নয়, বরং কাঁধে করে শোভাযাত্রার মাধ্যমে কাঞ্চনতলার গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী **বাইচ প্রতিযোগিতা**, যা বহু মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
তারপর গঙ্গার জলে প্রতিমা নিরঞ্জনের মাধ্যমে পুজোর সমাপ্তি ঘটে। ধর্মীয় আচার, লোকসংস্কৃতি এবং নদীকেন্দ্রিক জনজীবনের এই অনন্য সমন্বয়ই সামশেরগঞ্জের এই বনেদি পুজোকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
### ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের জীবন্ত নিদর্শন
বর্তমান সময়ে থিমপুজোর জৌলুস যতই বাড়ুক, সামশেরগঞ্জের কাঞ্চনতলা জমিদারবাড়ির এই দুর্গাপুজো এখনও প্রাচীন বিশ্বাস, পারিবারিক সংস্কার এবং স্থানীয় মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতীক হয়ে রয়েছে।
দুর্গার সঙ্গে মা গঙ্গার যুগল আরাধনা শুধু একটি ধর্মীয় রীতি নয়, বরং নদীভাঙনের বিরুদ্ধে মানুষের আশা, প্রার্থনা এবং ঐতিহ্যের এক জীবন্ত স্মারক হিসেবেও আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।


