দেশে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে ফের বড় ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রী নিতিন গড়করি। তাঁর দাবি, খুব শীঘ্রই ভারতে ১০০ শতাংশ ইথানলে চলতে সক্ষম একটি নতুন গাড়ি বাজারে আসতে চলেছে। এই গাড়ির চলার খরচ এমন হবে, যেন পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি মাত্র ২৫ টাকা। একই সঙ্গে তিনি জানান, টয়োটার একটি ফ্লেক্স-ফুয়েল ইনোভা মডেল অক্টোবর মাসে আত্মপ্রকাশ করতে পারে, যা সম্পূর্ণ ইথানলে চলবে এবং হাইব্রিড প্রযুক্তির সাহায্যে চলার সময় বিদ্যুতেরও ব্যবহার করবে।
দিল্লির এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে গড়করি বলেন, ইথানল নিয়ে দেশে যে বিতর্ক চলছে, তার অনেকটাই বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। তাঁর দাবি, বিশ্বের অন্তত ১৯টি দেশে ইথানলভিত্তিক জ্বালানি ব্যবহার হচ্ছে এবং ভারতে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহারের ফলে গাড়ির ইঞ্জিন নিয়ে কোনও বড় অভিযোগ সরকারের কাছে আসেনি।
### কী বললেন গড়করি?
মন্ত্রী জানান, তাঁকে অক্টোবর মাসে টয়োটার ইনোভা ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ির উদ্বোধনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এটি এমন একটি গাড়ি হবে যা E100, অর্থাৎ ১০০ শতাংশ ইথানলে চলতে পারবে। তিনি আরও দাবি করেন, এই গাড়ির হাইব্রিড প্রযুক্তির কারণে চলার সময় প্রায় ৬০ শতাংশ সময় বিদ্যুতের সহায়তায় চলতে সক্ষম হবে, ফলে জ্বালানির খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
তবে তিনি যে “লিটারপ্রতি ২৫ টাকার সমান” খরচের কথা বলেছেন, সেটি সরাসরি ইথানলের বাজারদর নয়; বরং গাড়ির সম্ভাব্য রানিং কস্টের তুলনামূলক হিসাব হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
### ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ি কী?
ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ি এমনভাবে তৈরি হয়, যাতে একই ইঞ্জিনে বিভিন্ন মাত্রার ইথানল-পেট্রোল মিশ্রণ ব্যবহার করা যায়। এই ধরনের যানবাহন E20 (২০ শতাংশ ইথানল) থেকে শুরু করে E100 (১০০ শতাংশ ইথানল) পর্যন্ত বিভিন্ন জ্বালানিতে চলতে সক্ষম।
বর্তমানে ভারতে অধিকাংশ নতুন গাড়ি E20-সমর্থিত হলেও E100 ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ইঞ্জিন ও প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ, সাধারণ পেট্রোলচালিত গাড়িতে সরাসরি ১০০ শতাংশ ইথানল ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
### কেন ইথানলের ওপর জোর?
গড়করির মতে, ভারতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হল বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি। তাঁর দাবি, দেশ বছরে প্রায় ২২ লক্ষ কোটি টাকার জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি করে। ইথানলের মতো দেশীয় বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে এই নির্ভরতা কমবে এবং একই সঙ্গে কৃষকরাও লাভবান হবেন।
তিনি বলেন, কৃষক শুধু “অন্নদাতা” নন, ভবিষ্যতে “উর্জাদাতা” হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। আখ, ভুট্টা ও অন্যান্য কৃষিজ পণ্য থেকে ইথানল উৎপাদনের ফলে কৃষকদের আয় বাড়ার সম্ভাবনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
### সরকারের পরিকল্পনা কী?
এর আগেই সরকার ১০০ শতাংশ ইথানল ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ম চূড়ান্ত করেছে। পাশাপাশি দেশে ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ির জন্য ধাপে ধাপে অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। সরকারি রোডম্যাপ অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে দিল্লি-এনসিআর, মুম্বই-পুণে ও নাগপুর করিডরে E85 ও উচ্চ ইথানল জ্বালানির পাম্প চালু করা হবে। পরে ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য বড় শহরেও এই নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।
### সাধারণ গাড়ির ক্ষেত্রে কী হবে?
বর্তমানে ভারতে E20 পেট্রোলের ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। তবে E100 ব্যবহার করতে হলে বিশেষ ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ি প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ, বর্তমানে যে সাধারণ পেট্রোলচালিত গাড়িগুলি রাস্তায় চলছে, সেগুলিকে সরাসরি E100-এ চালানো যাবে না। নতুন প্রযুক্তির গাড়ি এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ধাপে ধাপে চালু হওয়ার পরই এই পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাব সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
### ভবিষ্যতের জ্বালানি নীতিতে নতুন অধ্যায়
ভারতে ইথানলভিত্তিক জ্বালানির প্রসারকে কেন্দ্র করে সরকার দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে একদিকে যেমন বিদেশি তেলের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে, অন্যদিকে কৃষি-ভিত্তিক জ্বালানি শিল্পও নতুন গতি পেতে পারে। তবে এর জন্য পর্যাপ্ত ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ি, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ভোক্তাদের সচেতনতা—এই তিনটি বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে।


