রাজ্যের স্কুলগুলিতে মিড-ডে মিল বা **PM POSHAN** প্রকল্পে শুধুমাত্র নিরামিষ খাবার পরিবেশনের সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিতর্ক ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। এবার এই সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে **কলকাতা হাই কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা (PIL)** দায়ের করা হয়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, স্কুলপড়ুয়া শিশুদের পুষ্টির প্রশ্নে একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় এবং সরকারকে বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করতে হবে।
সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কলকাতা পুরসভার আওতাধীন সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বহু স্কুলে মিড-ডে মিলের দায়িত্ব **ইস্কন (ISKCON)**-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। নতুন মেনুতে ডিম বাদ দিয়ে সয়া, পনির, রাজমা, ডাল এবং অন্যান্য নিরামিষ খাদ্য অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকার ও ইস্কনের দাবি, এই খাবারগুলিও পর্যাপ্ত পুষ্টিগুণ সরবরাহ করতে সক্ষম।
কেন হাই কোর্টে মামলা?
জনস্বার্থ মামলায় আবেদনকারীদের বক্তব্য, মিড-ডে মিল প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুদের পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং স্কুলে উপস্থিতির হার বৃদ্ধি করা। বহু বছর ধরে সপ্তাহে অন্তত একদিন ডিম দেওয়া হত, যা শিশুদের জন্য সহজলভ্য ও উচ্চমানের প্রোটিনের উৎস হিসেবে বিবেচিত। সেই ব্যবস্থা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হলে বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পুষ্টির উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
আবেদনকারীরা আরও দাবি করেছেন, খাদ্যতালিকায় এত বড় পরিবর্তনের আগে বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং জনস্বার্থের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত ছিল। সেই কারণেই আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
সরকারের অবস্থান কী?রাজ্য সরকারের বক্তব্য, নিরামিষ খাদ্য মানেই অপুষ্টিকর নয়। শিক্ষা দফতরের মতে, সয়া, ডাল, রাজমা, পনির ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের মাধ্যমে শিশুদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করা সম্ভব। একই সঙ্গে খাবারের মান, পরিচ্ছন্নতা এবং রান্নার প্রক্রিয়াকে আরও উন্নত করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
সরকার আরও জানিয়েছে, খাবারের খরচও বাড়ানো হয়েছে যাতে উন্নতমানের উপকরণ ব্যবহার করা যায় এবং শিশুদের আরও স্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন করা সম্ভব হয়।
পুষ্টিবিদদের মত কী?
এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে পুষ্টিবিদদের মধ্যেও ভিন্ন মত রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ডিম শিশুদের জন্য একটি সহজলভ্য ও সম্পূর্ণ প্রোটিনের উৎস। এতে উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি ভিটামিন, মিনারেল এবং কোলিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান থাকে, যা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক।
অন্যদিকে, কিছু বিশেষজ্ঞের মতে সঠিক পরিকল্পনা করে সয়া, পনির, ডাল ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ খাদ্যের সমন্বয় ঘটালে পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে সেই ক্ষেত্রে খাবারের মান ও পরিমাণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
রাজনৈতিক বিতর্কও তুঙ্গে
এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। বিরোধীদের অভিযোগ, শিশুদের পুষ্টির বিষয়টিকে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়। অন্যদিকে, সরকারের দাবি—এটি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং এর লক্ষ্য শিশুদের উন্নতমানের, স্বাস্থ্যকর ও পরিচ্ছন্ন খাবার সরবরাহ করা।
হাই কোর্টের দিকে নজর
জনস্বার্থ মামলা দায়ের হওয়ার পর এখন সকলের নজর কলকাতা হাই কোর্টের দিকে। আদালত যদি মামলাটি গ্রহণ করে, তাহলে রাজ্য সরকারের কাছে এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি, পুষ্টিগত মূল্যায়ন এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হতে পারে। আদালতের পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে মিড-ডে মিল প্রকল্পের খাদ্যতালিকা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই মামলা?
মিড-ডে মিল প্রকল্প দেশের বৃহত্তম স্কুল পুষ্টি কর্মসূচিগুলির অন্যতম। লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী প্রতিদিন এই প্রকল্পের মাধ্যমে দুপুরের খাবার পায়। তাই খাদ্যতালিকায় কোনও পরিবর্তন শুধুমাত্র প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং তা শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
এই কারণেই নিরামিষ খাবার চালুর সিদ্ধান্তকে ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন আদালতের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। আগামী দিনে কলকাতা হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ এবং নির্দেশ এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিশা দেখাতে পারে।


