দার্জিলিং ভ্রমণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল ঐতিহ্যবাহী টয় ট্রেন। পাহাড়ি প্রকৃতির বুক চিরে ধীরগতিতে চলা এই ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতা নিতে প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটক উত্তরবঙ্গে ছুটে আসেন। কিন্তু এবার পর্যটকদের জন্য এল কিছুটা হতাশার খবর। আপাতত বন্ধ রাখা হচ্ছে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের (DHR) টয় ট্রেন পরিষেবা। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের কাজের জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।
বর্ষাকালে পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টির কারণে প্রায়ই ধস, পাথর গড়িয়ে পড়া এবং রেললাইনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে যাত্রীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই সাময়িকভাবে পরিষেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষের মতে, ট্র্যাকের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় মেরামত এবং নিরাপত্তা পর্যালোচনার কাজ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত পরিষেবা চালু করা হবে না।
দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে শুধুমাত্র একটি পরিবহণ ব্যবস্থা নয়, এটি ভারতের অন্যতম ঐতিহাসিক ঐতিহ্য। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো এই পাহাড়ি রেলপথকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত প্রায় ৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সরু গেজের রেলপথ পাহাড়ি সৌন্দর্যের এক অনন্য অভিজ্ঞতা উপহার দেয়। বাতাসিয়া লুপ, ঘুম স্টেশন, চা-বাগান এবং পাহাড়ি গ্রামগুলোর মধ্য দিয়ে চলা এই ট্রেনই পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ।
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্ষার সময় পাহাড়ে মাটি আলগা হয়ে যাওয়া, ছোট-বড় ধস এবং জল জমে যাওয়ার কারণে রেল চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। তাই কোনওরকম দুর্ঘটনার সম্ভাবনা এড়াতেই এই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ট্র্যাক, সেতু এবং অন্যান্য অবকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শনের পরই পরিষেবা পুনরায় চালু করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই ঘোষণার ফলে পর্যটন শিল্পেও কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। বিশেষ করে যাঁরা শুধুমাত্র টয় ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতা নিতে দার্জিলিং সফরের পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন সফরের সময়সূচি পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। হোটেল ব্যবসায়ী ও স্থানীয় পর্যটন ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ব্যক্তিরা আশা করছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হলে পরিষেবা আবার চালু হবে এবং পর্যটকদের আগমনও স্বাভাবিক হবে।তবে রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাত্রীদের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনওরকম আপস করা হবে না। সমস্ত নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পূর্ণ হওয়ার পরই টয় ট্রেনকে আবার লাইনে নামানো হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে ট্র্যাকের অতিরিক্ত সংস্কারও করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনও ঝুঁকি না থাকে।
পর্যটকদের উদ্দেশ্যে জানানো হয়েছে, যাঁরা ইতিমধ্যেই টিকিট কেটেছেন, তাঁদের জন্য রেলের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী রিফান্ড বা পুনর্নির্ধারণের ব্যবস্থা করা হবে। পরিষেবা চালু হওয়ার নতুন তারিখও রেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা দেশের গর্ব। তাই এই ঐতিহ্যবাহী রেলপথের নিরাপদ পরিচালনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সাময়িক অসুবিধা হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের রক্ষণাবেক্ষণই পরিষেবাকে আরও নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য করে তুলবে।
পর্যটকদের জন্য আপাতত পরামর্শ, দার্জিলিং সফরের আগে টয় ট্রেন পরিষেবা চালু হয়েছে কিনা, তা অবশ্যই সরকারি সূত্র বা রেলের ঘোষণার মাধ্যমে যাচাই করে নিন। পরিষেবা স্বাভাবিক হলে আবারও পাহাড়ের বুক চিরে চলবে এই ঐতিহাসিক টয় ট্রেন, আর ফিরবে সেই চিরচেনা নস্টালজিয়া।


