দলীয় তহবিলকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবার নতুন মাত্রা পেল। প্রায় ৪৪০ কোটি টাকার বিপুল অর্থভাণ্ডার ঘিরে শুরু হওয়া বিতর্ক এখন শুধুমাত্র রাজনৈতিক মহলের আলোচনার বিষয় নয়, বরং তা আইনি ও প্রশাসনিক তদন্তের কেন্দ্রে চলে এসেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে বিধাননগর পুলিশ ইতিমধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেসের তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখতে উদ্যোগী হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের কাছে গত পাঁচ বছরের সমস্ত আর্থিক নথি ও লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে।
সূত্রের খবর, দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক তৃণমূল বিধায়ক পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পরই এই তদন্তের সূচনা হয়। ওই বিধায়ককে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, দলের কয়েকটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সন্দেহজনক উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি প্রশাসনের কাছে আবেদন জানান যাতে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলির লেনদেন অবিলম্বে স্থগিত করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করা হয়।
অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত পদক্ষেপ নেয় বিধাননগর পুলিশ। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শরৎ বসু রোডে অবস্থিত একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কে থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের তিনটি অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ’ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, এই তিনটি অ্যাকাউন্টে বর্তমানে প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা জমা রয়েছে। ফলে বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়ে গিয়েছে।
শুধু বর্তমান আর্থিক লেনদেন নয়, তদন্তকারীরা অ্যাকাউন্টগুলির সূচনালগ্নের তথ্যও সংগ্রহ করতে চাইছেন। কোন সময়ে অ্যাকাউন্টগুলি খোলা হয়েছিল, সেই সময় কী কী নথি জমা দেওয়া হয়েছিল, কারা অনুমোদিত স্বাক্ষরকারী বা সিগনেটরি হিসেবে নাম নথিভুক্ত করেছিলেন এবং পরবর্তীতে সেই তথ্যের কোনও পরিবর্তন হয়েছে কি না— এই সমস্ত তথ্য ব্যাঙ্কের কাছ থেকে চাওয়া হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, এই তথ্যগুলি হাতে এলে অ্যাকাউন্টগুলির পরিচালনা এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
এদিকে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে দলের কোষাধ্যক্ষ পদ নিয়েও মতবিরোধ। অভিযোগ দায়ের হওয়ার কয়েকদিন আগে তৃণমূলের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে নিজেকে দলের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ প্রকাশ্যে জানান, অরূপ বিশ্বাস আর ওই দায়িত্বে নেই। তাঁর দাবি, গত ৫ জুন অনুষ্ঠিত কর্মসমিতির বৈঠকে শুভাশিস চক্রবর্তীকে দলের নতুন কোষাধ্যক্ষ হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে।
তবে তদন্তকারীদের বক্তব্য, দলীয় সিদ্ধান্তে কোষাধ্যক্ষ পরিবর্তন হলেও ব্যাঙ্কের নথিতে সেই পরিবর্তন কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। অর্থাৎ, ব্যাঙ্কের নথিপত্রে পুরনো এবং নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবস্থান নিয়ে এখনও অস্পষ্টতা রয়েছে। এই বিষয়টিকেই তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ের পাশাপাশি এই বিতর্ক এখন আদালতের দোরগোড়াতেও পৌঁছে গিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ শিবির কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করে ফ্রিজ করা অ্যাকাউন্টগুলি পুনরায় সচল করার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে অরূপ বিশ্বাস বর্তমানে বিদ্রোহী শিবিরের সঙ্গে রয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা চলছে। ফলে দলীয় তহবিলের উপর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি কেবল অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানও। প্রায় ৪৪০ কোটি টাকার এই তহবিল ঘিরে চলা তদন্তের অগ্রগতি আগামী দিনে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে সকলের নজর রয়েছে পুলিশের তদন্ত এবং আদালতের পরবর্তী নির্দেশের দিকে। তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এলে এই বিতর্ক আরও বড় আকার নিতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।



