ফুটবল কখনও শুধুমাত্র জয়-পরাজয়ের খেলা নয়, বরং আবেগ, স্মৃতি এবং সম্পর্কেরও এক অনন্য মেলবন্ধন। সেই ছবিই আরও একবার দেখা গেল ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এ। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ২-১ ব্যবধানে নাটকীয় জয় তুলে নিয়ে শেষ ষোলোয় পৌঁছে যায় পর্তুগাল। তবে ম্যাচের ফলাফলের থেকেও বেশি আলোচনায় উঠে আসে অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর হৃদয়স্পর্শী শ্রদ্ধার্ঘ্য, যা তিনি তাঁর প্রয়াত সতীর্থ ডিয়োগো জোটার উদ্দেশে নিবেদন করেন। জোটার মৃত্যুর প্রথম বার্ষিকীতে গোটা পর্তুগাল দল তাঁকে স্মরণ করে আবেগে ভেসে যায়।
টরন্টোতে অনুষ্ঠিত এই নকআউট ম্যাচে শুরু থেকেই দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেয়। প্রথমে পিছিয়ে পড়লেও দ্বিতীয়ার্ধে পেনাল্টি থেকে গোল করে সমতা ফেরান ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। এরপর যোগ করা সময়ে গনসালো রামোস জয়সূচক গোল করে পর্তুগালকে ২-১ ব্যবধানে জয় এনে দেন। এই জয়ের ফলে পর্তুগাল বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করে।
তবে ম্যাচ শেষের পর স্টেডিয়ামে তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। শেষ বাঁশি বাজতেই রোনাল্ডো ডিয়োগো জোটার ২১ নম্বর জার্সি হাতে তুলে নেন। সেই জার্সি পরে তিনি দর্শকদের সামনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে জোটাকে স্মরণ করেন। তাঁর চোখে জল স্পষ্ট ধরা পড়ে। এই দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় এবং ফুটবলপ্রেমীদের আবেগাপ্লুত করে তোলে।
ম্যাচের পরে রোনাল্ডো বলেন, এই দিনটির গুরুত্ব নিয়ে ম্যাচের আগেই গোটা দল আলোচনা করেছিল। তিনি জানান, “আজকের এই জয় শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের জয় নয়। আমরা জানি, ডিয়োগো আমাদের সঙ্গে রয়েছে। ওর স্মৃতিকে সম্মান জানাতেই এই জয়টা আমাদের কাছে বিশেষ।” তাঁর এই বক্তব্য ফুটবল বিশ্বের অসংখ্য সমর্থকের মন ছুঁয়ে যায়।
ডিয়োগো জোটা ২০২৫ সালের ৩ জুলাই স্পেনে এক মর্মান্তিক গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর ভাই আন্দ্রে সিলভার সঙ্গে প্রাণ হারান। মাত্র ২৮ বছর বয়সে তাঁর অকালপ্রয়াণ শুধু পর্তুগাল নয়, গোটা ফুটবল বিশ্বকে শোকস্তব্ধ করে দিয়েছিল। জাতীয় দলের হয়ে তিনি ৪৯টি ম্যাচে ১৪টি গোল করেছিলেন এবং দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর এক বছর পূর্তিতে পর্তুগিজ ফুটবলাররা আবারও তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানালেন।
শুধু রোনাল্ডোই নন, গোটা পর্তুগাল দল বিশেষভাবে জোটাকে স্মরণ করে মাঠে নামে। জাতীয় সঙ্গীতের সময় রুবেন নেভেস জোটার স্মৃতিবিজড়িত একটি ব্যান্ডে চুম্বন করেন। স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় জোটার ছবি প্রদর্শিত হয় এবং সমর্থকেরা দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। ম্যাচের ২১তম মিনিটে দর্শকদের হাতে থাকা ‘২১’ লেখা ব্যানার ও বেলুন গোটা পরিবেশকে আরও আবেগঘন করে তোলে।
পর্তুগালের কোচ রবার্তো মার্তিনেজও জোটাকে স্মরণ করে বলেন, “ডিয়োগো আমাদের আলো। আমরা ওকে সবসময় দলের অংশ হিসেবেই দেখি। বিশ্বকাপে আমাদের প্রতিটি লড়াই ওর জন্যও।” তাঁর এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট, দলের প্রতিটি সদস্য এখনও জোটার অনুপস্থিতি গভীরভাবে অনুভব করেন।
এই ম্যাচে রোনাল্ডো আরও একটি নজির গড়েন। ৪১ বছর বয়সে নকআউট পর্বে গোল করে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করা ফুটবলারদের অন্যতম হয়ে ওঠেন। কিন্তু ব্যক্তিগত রেকর্ডের চেয়েও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল জোটার স্মৃতিকে সম্মান জানানো। ম্যাচের পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্পষ্ট বলেন, “আজকের জয় আমরা ডিয়োগোর জন্য উৎসর্গ করছি।”
পর্তুগালের এই আবেগঘন মুহূর্ত বিশ্বজুড়ে ফুটবল সমর্থকদের মনে দাগ কেটেছে। খেলাধুলা যে শুধুমাত্র প্রতিযোগিতা নয়, বরং মানুষের সম্পর্ক, বন্ধুত্ব এবং স্মৃতিরও প্রতীক— রোনাল্ডো ও তাঁর সতীর্থরা তা আরও একবার প্রমাণ করে দিলেন। এখন শেষ ষোলোয় স্পেনের বিরুদ্ধে বড় পরীক্ষার অপেক্ষায় পর্তুগাল। তবে জোটার স্মৃতি যে তাঁদের লড়াইয়ে অতিরিক্ত অনুপ্রেরণা জোগাবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।


