ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচনী ফলাফলকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেল কলকাতা হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে শুভেন্দু অধিকারীর জয়ের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোট গণনায় অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে তিনি একটি ইলেকশন পিটিশন দাখিল করেন। মঙ্গলবার সেই মামলার শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্ট একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করেছে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ভবানীপুর কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ ও ভোট গণনার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি, তথ্যপ্রমাণ এবং প্রযুক্তিগত রেকর্ড সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। বিচারপতি বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে সংশ্লিষ্ট ইভিএম (EVM), ভিভিপ্যাট (VVPAT) এবং ভোট গণনার যাবতীয় নথি যেন কোনওভাবেই নষ্ট না হয় বা পরিবর্তিত না করা হয়। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই সমস্ত তথ্যপ্রমাণ অক্ষত অবস্থায় রাখতে হবে।
শুধু তাই নয়, আদালত ভোট গণনার সময় ব্যবহৃত সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ভবানীপুর কেন্দ্রের ভোট গণনা হয়েছিল কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে। সেই গণনাকেন্দ্রের ভিতরে এবং বাইরে স্থাপিত সমস্ত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, ভবিষ্যতে মামলার শুনানির সময় এই ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই কোনও তথ্য যেন হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
এদিনের শুনানিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয় কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত জানায়, মামলার যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তির জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় পক্ষকে মামলার অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। সেই কারণে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, সুনীল আগরওয়াল এবং সুব্রত গুপ্তকে মামলার পক্ষভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মামলার পরবর্তী পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সকলের বক্তব্য আদালতের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ভবানীপুর কেন্দ্র বরাবরই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রটি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে কারণ এখানে মুখোমুখি লড়াই হয়েছিল দুই প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারীর মধ্যে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, শুভেন্দু অধিকারী ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন।
তবে ফল ঘোষণার পর থেকেই নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, ভোট গণনার সময় একাধিক অনিয়ম হয়েছে এবং সেই কারণেই প্রকৃত ফলাফল প্রভাবিত হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই তিনি কলকাতা হাইকোর্টে নির্বাচন পিটিশন দায়ের করেন। মামলায় তিনি ভোট গণনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষণের আবেদনও জানান।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আদালতের এই নির্দেশ আপাতত মামলার মূল অভিযোগের সত্যতা নিয়ে কোনও মন্তব্য নয়। বরং ভবিষ্যতে মামলার বিচার প্রক্রিয়া যাতে স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক হয়, সেই উদ্দেশ্যেই সমস্ত তথ্যপ্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মামলার পরবর্তী শুনানিতে আদালত প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট নথি, ইভিএম তথ্য, ভিভিপ্যাট রেকর্ড এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করতে পারবে।
কলকাতা হাইকোর্ট জানিয়েছে, প্রায় দুই মাস পর মামলাটির পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। সেই সময় আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সংরক্ষিত তথ্যপ্রমাণ এবং মামলার অন্যান্য দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। ফলে ভবানীপুর কেন্দ্রের নির্বাচনী ফলাফলকে ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনি লড়াই আগামী দিনে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।



