নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনের আগে ফের আইনি জটিলতায় কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান। বর্তমানে একাধিক মামলায় বিচারবিভাগীয় হেফাজতে থাকা মিলন প্রধান এবার আরও পাঁচটি মামলায় গ্রেপ্তারির আশঙ্কা প্রকাশ করে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। সোমবার তাঁর আইনজীবী অয়ন ভট্টাচার্য বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের এজলাসে বিষয়টি উল্লেখ করেন। আইনজীবীর বক্তব্য শোনার পর ওই পাঁচটি মামলায় রক্ষাকবচ চেয়ে আবেদন করার অনুমতি দিয়েছে আদালত। মঙ্গলবার এই মামলার শুনানি হওয়ার কথা।
জানা গিয়েছে, বর্তমানে মিলন প্রধান একাধিক পুরনো মামলায় বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে নন্দীগ্রাম ও খেজুরি এলাকায় দায়ের হওয়া মামলাগুলির সূত্র ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়কার ঘটনাগুলির সঙ্গে যুক্ত। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে খুন, খুনের চেষ্টা, অপহরণ করে হত্যার চেষ্টা, প্রমাণ লোপাট, বেআইনি প্রবেশ এবং অস্ত্র-সহ দাঙ্গার মতো অভিযোগে মামলা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে থাকা জামিন-অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার জন্যই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মিলন প্রধানের বিরুদ্ধে চারটি পুরনো মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা হয়েছিল। ১৮ সেপ্টেম্বর তাঁকে একটি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী সময়ে আরও চারটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে তাঁর আইনজীবী আদালতে জানান। এই মামলাগুলিতে তিনি বর্তমানে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন। এর বাইরে আরও পাঁচটি মামলা রয়েছে, যেগুলিতে সম্ভাব্য গ্রেপ্তারি এড়াতে এবার হাই কোর্টে আবেদন করা হয়েছে।
সোমবার আদালতে মিলন প্রধানের আইনজীবী অয়ন ভট্টাচার্য জানান, তাঁর মক্কেল নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনে কংগ্রেসের প্রার্থী। আগামী ৬ অক্টোবর ওই কেন্দ্রে ভোট হওয়ার কথা এবং ৪ অক্টোবর প্রচার শেষ হবে। কিন্তু প্রার্থী বর্তমানে জেলে থাকায় নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে আরও পাঁচটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে ওই মামলাগুলিতে আদালতের কাছ থেকে সুরক্ষা চাওয়া হয়েছে।
বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য আইনজীবীকে এই বিষয়ে আবেদন দায়ের করার অনুমতি দিয়েছেন। মঙ্গলবার মামলাটি শুনবে আদালত। অর্থাৎ, বর্তমানে মিলন প্রধান যে মামলাগুলিতে হেফাজতে রয়েছেন, সেগুলির বিষয়ে এই আবেদনে কোনও পৃথক স্বস্তি চাওয়া হয়নি। বরং অতিরিক্ত পাঁচটি মামলায় যাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা না হয়, সেই বিষয়ে সুরক্ষা চাওয়া হয়েছে। আদালতে এই আবেদন গ্রহণের পর এখন বিচারপতির পরবর্তী নির্দেশের দিকে নজর রয়েছে।
এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুর থেকে মিলন প্রধানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছিল, ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়কার একটি পুরনো মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে থাকা জামিন-অযোগ্য পরোয়ানা কার্যকর করতেই এই গ্রেপ্তার। পরদিন হলদিয়া মহকুমা আদালত তাঁকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠায়। অর্থাৎ ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে পর্যন্ত তাঁকে জেলে থাকতে হবে—যদি না আদালত পরবর্তী সময়ে অন্য কোনও নির্দেশ দেয়।
মিলন প্রধানের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলির অধিকাংশই প্রায় দুই দশক পুরনো। পুলিশের দাবি, ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়কার হিংসাত্মক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত অভিযোগে এই মামলাগুলি দায়ের হয়েছিল। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলাগুলির মধ্যে খুন, খুনের চেষ্টা, অপহরণ, প্রমাণ নষ্ট করা, বাড়িতে বেআইনি প্রবেশ এবং অস্ত্র-সহ দাঙ্গার মতো অভিযোগ রয়েছে। তবে কোনও মামলায় অভিযোগ থাকা এবং আদালতে সেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়; সংশ্লিষ্ট মামলাগুলির বিচারপ্রক্রিয়াই অভিযোগগুলির আইনি নিষ্পত্তি নির্ধারণ করবে।
এই পরিস্থিতিতে নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণেও মিলন প্রধানের গ্রেপ্তারি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ভোটের দিন ধার্য হয়েছে ৬ অক্টোবর। মনোনয়ন পর্ব থেকেই নন্দীগ্রামকে ঘিরে একাধিক রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। শুক্রবার তৃণমূলের মমতা-সমর্থিত প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেন যে তাঁর দল নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করবে। সেই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মিলন প্রধান গ্রেপ্তার হন। সময়ের এই ক্রম নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হলেও, গ্রেপ্তারির ক্ষেত্রে পুলিশ দীর্ঘদিনের জামিন-অযোগ্য পরোয়ানার কথা জানিয়েছে।
মিলন প্রধানের গ্রেপ্তারির পর তাঁর হয়ে প্রচারে তাঁর স্ত্রী অর্পিতা প্রধানকে দেখা যায়। একটি ভিডিও বার্তায় তিনি নন্দীগ্রামের মানুষের কাছে তাঁর স্বামীকে ভোট দেওয়ার আবেদন জানান এবং গ্রেপ্তারি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অন্যদিকে, পুলিশের বক্তব্য হচ্ছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে নয়, বরং পুরনো মামলায় দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর না হওয়া পরোয়ানার ভিত্তিতেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফলে এই ঘটনায় রাজনৈতিক দলগুলির বক্তব্য এবং পুলিশের ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
এখন মূল নজর কলকাতা হাই কোর্টের মঙ্গলবারের শুনানির দিকে। আরও পাঁচটি মামলায় মিলন প্রধানকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না, কিংবা আদালত তাঁকে কোনও ধরনের সুরক্ষা দেবে কি না, তা শুনানির পর স্পষ্ট হবে। একইসঙ্গে যে মামলাগুলিতে তিনি ইতিমধ্যে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন, সেগুলির আইনি প্রক্রিয়াও চলবে। ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনের আগে এই আইনি পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয় কি না, তা নন্দীগ্রামের নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


