ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূল কংগ্রেসের অফিসের মাথা থেকে বিলবোর্ড সরানো নিয়ে আইনি লড়াই এবার পৌঁছেছিল সুপ্রিম কোর্টে। সোমবার সেই মামলায় বড় কোনও অন্তর্বর্তী স্বস্তি পেল না তৃণমূল। কলকাতা পুরসভার সরানো বিলবোর্ড নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল দলটি। তবে সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি নিজেদের হাতে নিয়ে তাৎক্ষণিক নির্দেশ না দিয়ে কলকাতা হাই কোর্টকে মামলাটি দ্রুত শুনে সমস্ত বিষয় নিষ্পত্তির অনুরোধ করেছে।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। আদালত স্পষ্ট করেছে, হাই কোর্টের আগের অন্তর্বর্তী পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। ফলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ হাই কোর্টে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরতে পারবে।
### কী নিয়ে এত বিতর্ক?
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে কলকাতার **৯, ক্যামাক স্ট্রিটের** একটি বহুতল ভবন। এই ভবনের সপ্তম ও অষ্টম তলায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিস রয়েছে। সম্প্রতি কলকাতা পুরসভার আধিকারিকরা ওই ভবনের উপরের অংশে থাকা তৃণমূলের নাম লেখা একটি বিলবোর্ড সরাতে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পুরসভার দাবি ছিল, বিলবোর্ডটি নিয়মবহির্ভূতভাবে লাগানো হয়েছিল এবং সেটি সরানো প্রয়োজন। সেই অভিযানে পুলিশও উপস্থিত ছিল। বিলবোর্ড খোলার সময় তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে প্রশাসনের বচসা এবং হাতাহাতির অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি পরে রাজনৈতিক সংঘাতের রূপ নেয়।
তৃণমূলের পক্ষ থেকে অবশ্য অভিযোগ করা হয়, কোনও যথাযথ নোটিস না দিয়েই বিলবোর্ড সরানো হয়েছে। দলের দাবি, বিলবোর্ড লাগানোর অধিকার তাদের রয়েছে এবং প্রশাসনের পদক্ষেপ আইনসঙ্গত ছিল না।
### সুপ্রিম কোর্টে কী বললেন কপিল সিব্বল?
তৃণমূলের হয়ে শীর্ষ আদালতে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল। তাঁর বক্তব্য ছিল, যে ভবনে দলীয় অফিস রয়েছে সেখানে দলের অধিকার রয়েছে এবং সেই কারণে বিলবোর্ড লাগানোর বিষয়টিও দলীয় অধিকারের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর অভিযোগ, কোনও নোটিস না দিয়েই প্রশাসন বিলবোর্ড সরিয়ে দিয়েছে।
সিব্বলের বক্তব্যের পাল্টা যুক্তি দেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হয়ে উপস্থিত সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তাঁর বক্তব্য ছিল, তৃণমূলের এই সমস্ত যুক্তি কলকাতা হাই কোর্টেই পেশ করা উচিত। মামলাটি ইতিমধ্যেই হাই কোর্টের বিচারাধীন হওয়ায় সেখানেই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে শোনা সম্ভব।
### ‘মামলা শেষ হয়ে যায়নি’, গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ শীর্ষ আদালতের
সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য এমন কোনও নির্দেশ দেয়নি যে তৃণমূলের দাবি চিরতরে খারিজ হয়ে গেল। বরং আদালত জানিয়েছে, বিলবোর্ড ইতিমধ্যেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে মামলাটি অর্থহীন হয়ে যায়নি। যদি পরবর্তী পর্যায়ে হাই কোর্ট মনে করে যে বিলবোর্ড সরানোর সিদ্ধান্ত বেআইনি ছিল, তাহলে সেটি পুনরুদ্ধারের বিষয়ও বিবেচনা করা যেতে পারে।
অর্থাৎ, এই মুহূর্তে মূল আইনি প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। বিলবোর্ড সরানোর পদক্ষেপ আইনসঙ্গত ছিল কি না, তৃণমূলের সেখানে সাইনবোর্ড রাখার অধিকার ছিল কি না এবং প্রশাসনের তরফে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্ন এখনও বিচারাধীন।
### কলকাতা হাই কোর্টে আগেই স্বস্তি মেলেনি
এর আগে তৃণমূল কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। কিন্তু হাই কোর্ট বিলবোর্ড পুনরায় লাগানো বা অবিলম্বে কোনও অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেওয়ার নির্দেশ দেয়নি। সেই অবস্থানকেই চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যায় তৃণমূল।
সোমবার শীর্ষ আদালতও সরাসরি অন্তর্বর্তী স্বস্তি না দিয়ে হাই কোর্টকেই দ্রুত মামলাটি বিবেচনা করার কথা বলেছে। ফলে আপাতত ক্যামাক স্ট্রিটের বিলবোর্ড নিয়ে তৃণমূলের আইনি লড়াই কলকাতা হাই কোর্টেই চলবে।
### বিলবোর্ড-কাণ্ডে রাজনৈতিক সংঘাতও তীব্র
ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনা শুধুমাত্র একটি সাইনবোর্ডের আইনি বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোরও তীব্র হয়েছে।
তৃণমূলের তরফে অভিযোগ করা হয়েছে, দলীয় অফিসকে লক্ষ্য করে প্রশাসনিক হয়রানি এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপি এই অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা দাবি করেছে, বেআইনি নির্মাণ বা অনুমোদনহীন বিলবোর্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলা যায় না।
ঘটনার সময় পুলিশের সঙ্গে বচসা ও হাতাহাতির অভিযোগ নিয়েও পৃথক তদন্ত চলছে। তৃণমূলের সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনকেও পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবিরকেও এই সংক্রান্ত ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে।
### অফিস নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন আইনি প্রশ্ন
ক্যামাক স্ট্রিটের ওই অফিসকে ঘিরে শুধু বিলবোর্ড নয়, ভবনটির দখল ও ব্যবহারের অধিকার নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ভবনের মালিকপক্ষ তৃণমূলকে জায়গাটি খালি করার জন্য আইনি নোটিস দিয়েছে এবং দখল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে তৃণমূলের পক্ষ থেকে ওই অফিস ব্যবহারের অধিকার থাকার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা নিয়েও প্রশাসনিক পদক্ষেপ হয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ দফতরের পরিদর্শনে একাধিক ঘাটতির অভিযোগ উঠে ওই ভবনের কয়েকটি অংশ খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসকে ঘিরে আইনি ও প্রশাসনিক—দুই ধরনের জটিলতাই তৈরি হয়েছে।
### এখন নজর কলকাতা হাই কোর্টে
সুপ্রিম কোর্টের সোমবারের নির্দেশের পর এখন ফের নজর কলকাতা হাই কোর্টের দিকে। শীর্ষ আদালত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিজেদের বক্তব্য হাই কোর্টে জানানোর স্বাধীনতা দিয়েছে এবং মামলার সমস্ত বিষয় দ্রুত নির্ধারণের অনুরোধ করেছে।
অর্থাৎ, আপাতত তৃণমূলের দাবি মেনে বিলবোর্ড পুনরায় লাগানোর নির্দেশ দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট। আবার বিলবোর্ড সরানোর সিদ্ধান্তকেও চূড়ান্তভাবে বৈধ বলে ঘোষণা করেনি। মূল বিতর্কের নিষ্পত্তি হবে হাই কোর্টে।
ফলে ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসের বিলবোর্ড নিয়ে তৃণমূলের আইনি লড়াই আরও কিছুদিন চলবে। প্রশাসনের পদক্ষেপ, দলীয় অধিকারের দাবি এবং বিলবোর্ড সরানোর পদ্ধতি—সবকিছুই এবার কলকাতা হাই কোর্টের পরবর্তী শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে।


