কলকাতায় তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়ির গার্ডরেলে গাড়ি ধাক্কা দেওয়ার ঘটনায় চাকরি হারানো এক পুলিশকর্মীর পাশে দাঁড়াল কলকাতা হাই কোর্ট। আদালত ওই পুলিশকর্মীকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত খারিজ করেছে এবং চার সপ্তাহের মধ্যে তাঁর চাকরির বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ-প্রশাসনকে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, ওই পুলিশকর্মীর ভুল হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ভুল চাকরি থেকে বরখাস্ত করার মতো গুরুতর ছিল না। ঘটনাটিতে কেউ আহত হয়েছেন, এমন অভিযোগও নেই বলে আদালত উল্লেখ করেছে।
মামলাটি শুনেছে বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি পার্থপ্রতিম রায়ের ডিভিশন বেঞ্চ। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসনকে চার সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। অর্থাৎ আদালত সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট শাস্তি নির্ধারণ না করে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত পুনরায় পর্যালোচনার সুযোগ দিয়েছে। আদালতের বক্তব্যে উঠে এসেছে, কর্মীর ভুলের জন্য শাস্তি হতে পারে, তবে সেই শাস্তি ঘটনার গুরুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
### কী ঘটেছিল ২০২৩ সালে?
ঘটনাটি ২০২৩ সালের। ধীরেন্দ্রনাথ মাহাতো কলকাতা পুলিশের গাড়ির চালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। একটি গাড়ি সরানোর সময় ভুলবশত সেটি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়ির গার্ডরেলে গিয়ে ধাক্কা মারে। ধাক্কায় বাড়ির প্রবেশপথের অংশেও গাড়ির আঘাত লাগে। এই ঘটনার পর তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় পদক্ষেপ শুরু হয়।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল। পরে সেই সাসপেনশন প্রত্যাহার করা হলে তিনি আবার কাজে যোগ দেন। কিন্তু বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়নি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে ফের শোকজ নোটিস দেওয়া হয়। কেন তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না, সেই বিষয়ে তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বরখাস্তের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন ধীরেন্দ্রনাথ মাহাতো। তাঁর হয়ে আদালতে সওয়াল করেন আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য এবং শতাব্দী দাস বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর মামলাটি ডিভিশন বেঞ্চে ওঠে এবং সেখানেই বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ সামনে আসে।
### দীর্ঘ চাকরিজীবনের কথাও উঠে এল
ধীরেন্দ্রনাথ মাহাতোর চাকরিজীবনের বিষয়টিও মামলার প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০০০ সালে কলকাতা পুলিশের গাড়িচালক হিসেবে তিনি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। অর্থাৎ চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার আগে তাঁর প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময়ের কর্মজীবন ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫ সালে তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন। এরপর তাঁকে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখা হত। আদালতে মামলার শুনানির সময় তাঁর দীর্ঘ চাকরিজীবন এবং ঘটনাটির প্রকৃতি—দুই বিষয়ই বিবেচনায় আসে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, আদালত ভুলের অস্তিত্ব অস্বীকার করেনি। বরং আদালত স্পষ্ট করেছে যে পুলিশকর্মীর ভুল হয়েছিল। কিন্তু সেই ভুলের জন্য সরাসরি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যথাযথ শাস্তি কি না, সেটিই ছিল মূল প্রশ্ন। আদালতের মতে, পরিস্থিতি বিবেচনা করে তুলনামূলক লঘু শাস্তির সুযোগ ছিল।
### আদালতের নির্দেশে কী হবে এবার?
ডিভিশন বেঞ্চের নির্দেশের পর এখন পুলিশ-প্রশাসনকে ধীরেন্দ্রনাথ মাহাতোর বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করতে হবে। চার সপ্তাহের মধ্যে সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে আদালতের নির্দেশের ভিত্তিতে প্রশাসনকে আগের বরখাস্তের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
এখানে আদালতের নির্দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—বরখাস্তের সিদ্ধান্ত বাতিল করার পাশাপাশি প্রশাসনকে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে পরবর্তী পর্যায়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিও নজরে থাকবে। মামলার চূড়ান্ত প্রশাসনিক পরিণতি সেই পুনর্বিবেচনার পরই স্পষ্ট হবে।
### অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি ঘিরে ঘটনা
ঘটনার সঙ্গে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়ির নাম জড়িয়ে থাকায় মামলাটি রাজনৈতিকভাবেও আলোচনায় এসেছে। তবে আদালতের মূল বিবেচনার বিষয় ছিল পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে নেওয়া বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং বরখাস্তের সিদ্ধান্তের যথার্থতা। আদালতের পর্যবেক্ষণে ওই পুলিশকর্মীর ভুলের গুরুত্ব এবং শাস্তির মাত্রার মধ্যে সামঞ্জস্যের বিষয়টিই প্রধান হয়ে উঠেছে।
Sangbad Pratidin-এর প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে অভিষেকের ‘রোষানলে’ চাকরি হারানোর অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এই ধরনের রাজনৈতিক ব্যাখ্যাকে আদালতের প্রতিষ্ঠিত তথ্য থেকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। প্রকাশিত আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে যে বিষয়গুলি স্পষ্ট, তা হল—২০২৩ সালে গাড়ি ধাক্কার ঘটনা ঘটে, এরপর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়, পুলিশকর্মীকে বরখাস্ত করা হয় এবং তিনি সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে মামলা করেন। শেষ পর্যন্ত ডিভিশন বেঞ্চ বরখাস্তের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছে।
### শাস্তির মাত্রা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
সরকারি চাকরিতে কোনও কর্মীর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গ বা দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগ উঠলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে শাস্তির মাত্রা নির্ধারণের সময় ঘটনার গুরুত্ব, ক্ষয়ক্ষতি, কর্মীর পূর্ববর্তী চাকরির রেকর্ড এবং অন্যান্য পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়। এই মামলাতেও আদালতের পর্যবেক্ষণে মূলত সেই সামঞ্জস্যের বিষয়টি সামনে এসেছে।
আদালত জানিয়েছে, গাড়ি দিয়ে গার্ডরেলে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনায় পুলিশকর্মী ভুল করেছিলেন। কিন্তু ঘটনাটিতে কেউ আহত হয়েছেন—এমন অভিযোগ নেই। তাই চাকরি থেকে সম্পূর্ণ বরখাস্ত না করে তুলনামূলক কম মাত্রার শাস্তি দেওয়ার সুযোগ ছিল বলে ডিভিশন বেঞ্চ মনে করেছে।
ফলে এই রায়ের পর শুধু ধীরেন্দ্রনাথ মাহাতোর চাকরির বিষয়টিই নয়, সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় ‘শাস্তির মাত্রা’ কতটা উপযুক্ত হওয়া উচিত, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে প্রশাসনের নতুন সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন মামলাকারী এবং সংশ্লিষ্ট মহল।


