নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনের আগে একের পর এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরগরম রাজ্য রাজনীতি। কংগ্রেসের প্রার্থী মিলন প্রধান গ্রেফতার হওয়ার পর এবার তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা তথা প্রাক্তন তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ সবুজ প্রধান মুখ খুললেন। মিলনের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তৃণমূল আমলে একটি সিদ্ধান্তকে দায়ী করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, তৃণমূল সরকারের সময়ে রাজনৈতিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া পুরনো মামলাগুলির মধ্যে কিছু মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। পরবর্তীতে সেই মামলাগুলিই নতুন করে সামনে আসার পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে দাবি সবুজের।
মিলন প্রধান বর্তমানে নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচনে কংগ্রেসের প্রার্থী। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম ভূমি আন্দোলনের সময়কার একটি পুরনো মামলার সূত্রে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা বকেয়া ছিল। আদালতে পেশ করার পর তাঁকে হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে কংগ্রেসের তরফে এই গ্রেফতারির সময় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। দলটির বক্তব্য, নির্বাচনের ঠিক আগে পুরনো মামলায় প্রার্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে পুলিশের তরফে গ্রেফতারির ভিত্তি হিসেবে পুরনো মামলায় থাকা আইনি প্রক্রিয়ার কথাই উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নন্দীগ্রামের পুরনো রাজনৈতিক ইতিহাসও ফের সামনে এসেছে। ২০০৭ সালের ৫ জানুয়ারি নন্দীগ্রামে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়েছিল। পাঁচটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে তৈরি সেই কমিটিতে মোট ১৫ জন সদস্য ছিলেন। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিলন প্রধানের প্রস্তাবেই সবুজ প্রধান ওই কমিটির সক্রিয় সদস্য হন। পরবর্তীতে দুজনের রাজনৈতিক পথ আলাদা হয়ে গেলেও নন্দীগ্রামের আন্দোলনের সময় তাঁদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ছিল।
সবুজ প্রধানের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে কংগ্রেসের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। তিনি ২০২০ সালে তৃণমূল ছাড়লেও কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বজায় ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে মিলন প্রধানের রাজনৈতিক শিকড় ছাত্র পরিষদে। পরবর্তীতে জেলিংহাম প্রকল্প এবং নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনকে ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন তিনি। সিপিএমের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির সঙ্গে যুক্ত হন মিলন ও সবুজ। এই রাজনৈতিক পর্বই তাঁদের দুজনের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মিলনের গ্রেফতারির পর হলদিয়া আদালত চত্বরে তাঁকে দেখতে যান সবুজ। সেখানে কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি শুভঙ্কর সরকারও উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিলনকে আদালতে দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন সবুজ। তাঁদের দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের কথাও সেখানে উঠে আসে। একই সময়ে কংগ্রেসের রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে সবুজের ফের সক্রিয়ভাবে কাজ করার সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে। দলের রাজ্য পর্যবেক্ষক প্রকাশ যোশির সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় এবং কংগ্রেসে ফিরে আসার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মিলনের বর্তমান আইনি পরিস্থিতি নিয়ে সবুজের বক্তব্যের মূল বিষয় হল পুরনো রাজনৈতিক মামলা। তাঁর দাবি, তৃণমূল সরকারের আমলে রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একাধিক মামলা হয়েছিল। তৃণমূলের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া কিছু মামলা প্রত্যাহার করা হলেও তৎকালীন বিরোধী সিপিএমের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া পালটা মামলাগুলিও প্রত্যাহার করা উচিত ছিল বলে তিনি তৎকালীন মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়কে জানিয়েছিলেন। তাঁর মতে, সেই মামলা প্রত্যাহার না হওয়ায় পরবর্তীতে সেগুলির ভিত্তিতেই নতুন আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তবে সবুজ প্রধানের এই বক্তব্য তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও দাবি হিসেবে দেখা হচ্ছে। পুরনো মামলাগুলির আইনি অবস্থান এবং মিলন প্রধানের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মিলনের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের একটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল এবং সেই ভিত্তিতেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক অভিযোগ এবং পুলিশের দেওয়া আইনি কারণ—দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
এদিকে মিলনের গ্রেফতারির আগে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। তৃণমূলের মনোনীত প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে তাঁর প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করেন। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবির কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করে। ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচন হওয়ার কথা। প্রার্থী প্রত্যাহারের পর এই সমর্থনের ঘোষণা এবং তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মিলনের গ্রেফতারি নির্বাচনী পরিস্থিতিকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মিলন প্রধানকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করে কংগ্রেসকে ‘স্বাভাবিক মিত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং বিরোধী ঐক্যের প্রসঙ্গ তুলেছেন। অন্যদিকে কংগ্রেসের রাজ্য নেতৃত্ব মিলনের গ্রেফতারিকে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্ন করেছে। কংগ্রেসের বক্তব্য, নির্বাচনের সময় প্রার্থীকে গ্রেফতার করার ফলে তাঁর প্রচারে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। তবে পুলিশের বক্তব্য, গ্রেফতারির সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারের কোনও সম্পর্ক নেই এবং এটি পুরনো মামলায় বকেয়া আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে হয়েছে।
মিলন প্রধানের হয়ে আইনি লড়াই চালানোর পাশাপাশি নির্বাচনী প্রচারও চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কংগ্রেস। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে দলের নতুন জেলা কমিটির সভাপতিদের নিয়ে গঠিত একটি দল এলাকায় গিয়ে প্রচার করবে। যুব ও ছাত্র সংগঠনের কর্মীদেরও প্রচারে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। মিলন জেল হেফাজতে থাকলেও তাঁর হয়ে নির্বাচনী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে দলীয় নেতৃত্ব।
নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে ২০০৭ সালের জমি আন্দোলনের গভীর যোগ রয়েছে। সেই আন্দোলনই পরবর্তী সময়ে রাজ্যের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে। সেই সময়কার একাধিক মামলা এখনও বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে রয়েছে। মিলন প্রধানের গ্রেফতারির ঘটনাও সেই পুরনো মামলার সূত্রেই সামনে এসেছে। ফলে উপনির্বাচনের আগে নন্দীগ্রামে বর্তমান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি প্রায় দুই দশক আগের রাজনৈতিক আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহও আলোচনায় ফিরে এসেছে।
অন্যদিকে মিলন প্রধানের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। একইভাবে তাঁর গ্রেফতারির রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কেও এখনই কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। নির্বাচনের আগে তিনি জামিন পান কি না, প্রচারে সরাসরি অংশ নিতে পারেন কি না এবং তাঁর হয়ে কংগ্রেস কীভাবে প্রচার চালায়—আগামী দিনগুলিতে এই বিষয়গুলিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আগে মিলন প্রধানের গ্রেফতারি, তৃণমূলের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে-র প্রার্থীপদ প্রত্যাহার এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত—তিনটি ঘটনাই নির্বাচনী সমীকরণে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তার মধ্যেই মিলনের পুরনো রাজনৈতিক সহযোদ্ধা সবুজ প্রধান তৃণমূল আমলের পুরনো মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য এবং পুলিশের দেওয়া গ্রেফতারির কারণ—দুই দিকই সামনে রেখে এখন নন্দীগ্রামের নির্বাচনী পরিস্থিতির দিকে নজর রয়েছে।


