পুরুলিয়া ও জঙ্গলমহল সংলগ্ন এলাকায় মাওবাদী কার্যকলাপ ঘিরে ফের বড়সড় পুলিশি তৎপরতার খবর সামনে এল। মাওবাদী নেতা কিষানজি এবং পরবর্তীকালে সংগঠনের অন্যতম শীর্ষ নেতা আকাশের দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করা মঙ্গল মাহাতো ও তাঁর স্ত্রী মালতি মুর্মুকে পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি থানা এলাকার সরবেড়িয়া গ্রাম থেকে আটক করেছে কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF) এবং পুলিশ—এমনটাই জানিয়েছে সংবাদ প্রতিদিন। শনিবার দুপুরে এক ধৃত মাওবাদী মদন মাহাতোর আত্মীয়ের বাড়ি থেকে তাঁদের দুজনকে পাকড়াও করা হয় বলে সূত্রের খবর। তবে শনিবার রাত পর্যন্ত তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার হয়েছেন, নাকি আত্মসমর্পণ করেছেন, সে বিষয়ে সরকারি ভাবে স্পষ্ট কোনও ঘোষণা করা হয়নি।
এই ঘটনার সঙ্গে কয়েক দিন আগের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রেপ্তারের যোগ রয়েছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর কলকাতা পুলিশের STF পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরের লালাট এলাকা থেকে সিপিআই (মাওবাদী)-র শীর্ষ নেতা অসীম মণ্ডল ওরফে আকাশকে গ্রেপ্তার করে। আকাশকে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর গ্রেপ্তারের পর জঙ্গলমহল ও পশ্চিমবঙ্গ-ঝাড়খণ্ড সীমান্তে আত্মগোপন করে থাকা তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের গতিবিধির উপর নজরদারি আরও বাড়ানো হয়।
পুলিশ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গল মাহাতো ওরফে মঙ্গল, পাপ্পু, সমীর বা পান্ডে দীর্ঘদিন ধরে মাওবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি সংগঠনের সাব-জোনাল কমিটির সদস্য ছিলেন এবং সশস্ত্র স্কোয়াডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ঝাড়খণ্ড পুলিশের তরফে পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর স্ত্রী মালতি মুর্মু ওরফে মালতি বা মালা সংগঠনের এরিয়া কমিটির সদস্য ছিলেন বলে পুলিশ সূত্রে দাবি করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধেও দুই লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
মঙ্গল মাহাতোর অতীতের সঙ্গে জঙ্গলমহলের মাওবাদী আন্দোলনের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের যোগ রয়েছে। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সাল নাগাদ তিনি মাওবাদী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত হন। প্রথম দিকে ক্যুরিয়ার হিসেবে কাজ করার পর তিনি স্কোয়াড সদস্য হন। পরবর্তী সময়ে লালগড় আন্দোলনের সময়ও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। এরপর তিনি কিষানজির দেহরক্ষীর দায়িত্ব পালন করেন।
কিষানজি, অর্থাৎ মল্লোজুলা কোটেশ্বর রাও, একসময় পূর্ব ভারতে মাওবাদী সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। ২০১১ সালের নভেম্বরে পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলে নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে তাঁর মৃত্যু হয়। ঐতিহাসিক নথিতেও দেখা যায়, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর নিরাপত্তা বলয়ের একাধিক সদস্য আত্মসমর্পণ করেছিলেন। ২০১২ সালের একটি নথিভুক্ত ঘটনায় কিষানজির দেহরক্ষী হিসেবে পরিচিত জগন্নাথ সরেন-সহ কয়েকজন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
অন্যদিকে মালতি মুর্মুর জীবনও ছোট বয়স থেকেই জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার গল্প বহন করে বলে সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবারের সূত্রের দাবি, মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি মাওবাদী স্কোয়াডে যোগ দেন। পরবর্তীতে মঙ্গল ও মালতির মধ্যে ‘কমরেড ম্যারেজ’ হয়। ২০১১ সালের পর তাঁরা দুজনেই ঝাড়খণ্ডে আকাশের স্কোয়াডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আত্মগোপনে চলে যান। প্রথমে পূর্ব সিংভূমের জঙ্গল, পরে দলমা এবং ঝাড়খণ্ডের বিস্তীর্ণ অরণ্য এলাকায় তাঁদের গতিবিধি ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মাওবাদী সংগঠনের উপর নিরাপত্তাবাহিনীর চাপ বাড়ার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মাও মুক্ত ভারত’ ঘোষণার পর অপারেশন কাগারের জেরে যৌথ বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের চাপে আকাশ-সহ প্রায় ১০ জন বাংলার দিকে ফিরে আসেন। এরপর ঝাড়খণ্ডে কয়েকজন মাওবাদী সদস্য গ্রেপ্তার হন এবং একজন আত্মসমর্পণ করেন। সংগঠনের সদস্য সংখ্যা কমে যাওয়ার পরিস্থিতিতে আকাশও শেষ পর্যন্ত স্কোয়াড ভেঙে শহরমুখী হন বলে পুলিশ সূত্রের দাবি।
এরই মধ্যে আকাশের গ্রেপ্তার হয় পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরে। জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলকাতা পুলিশের STF তাঁকে তাঁর শ্বশুরবাড়ির এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক রাজ্যে বহু মামলা রয়েছে এবং ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশায় তাঁর মাথার উপর মোট দুই কোটিরও বেশি টাকার পুরস্কার ছিল বলে পুলিশ সূত্রে দাবি করা হয়েছে। STF তাঁর কাছ থেকে সংগঠনের নথি ও বই উদ্ধার করেছে বলেও জানানো হয়।
আকাশ গ্রেপ্তারের পরেই মঙ্গল ও মালতির অবস্থান খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া শুরু হয় বলে জানা যাচ্ছে। তদন্তকারীদের সূত্রে দাবি, আকাশকে জিজ্ঞাসাবাদের পর মঙ্গল ও তাঁর স্ত্রীর সম্ভাব্য গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে আকাশের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মঙ্গল জঙ্গলে অস্ত্র লুকিয়ে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে পশ্চিম মেদিনীপুরের দিকে চলে আসেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত শালবনির সরবেড়িয়া গ্রাম থেকে তাঁদের দুজনকে আটক করা হয়।
এই গ্রেপ্তারের ফলে পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ড সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা মাওবাদী নেটওয়ার্কের অবশিষ্ট সদস্যদের নিয়ে পুলিশের নজরদারি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বর্তমান ঘটনায় মঙ্গল ও মালতির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোন কোন ধারায় মামলা করা হয়েছে, তাঁদের কাছ থেকে কী কী সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে এবং তাঁরা আদালতে কবে পেশ হবেন—এসব বিষয়ে সরকারি ভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাচ্ছে না।
আকাশের গ্রেপ্তারের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর পুরনো ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও দেহরক্ষী হিসেবে পরিচিত মঙ্গল এবং তাঁর স্ত্রী মালতির আটক হওয়া তাই তদন্তের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। একইসঙ্গে, তাঁরা সত্যিই গ্রেপ্তার হয়েছেন নাকি আত্মসমর্পণ করেছেন—এই প্রশ্নেরও সরকারি ব্যাখ্যা সামনে আসা এখনও বাকি। ফলে পরবর্তী পুলিশি তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ায় এই অভিযানের আরও তথ্য প্রকাশ্যে আসতে পারে।


