পশ্চিমবঙ্গে এবার প্রথমবারের মতো আয়োজিত হতে চলেছে প্রবাসী ভারতীয় দিবসের মূল অনুষ্ঠান। আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালের ৭ থেকে ৯ জানুয়ারি তিন দিন ধরে এই বিশেষ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী ভারতীয়দের একটি বড় অংশ এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন। প্রায় ৭৫টি দেশ থেকে ১০ থেকে ১২ হাজার প্রবাসী ভারতীয় কলকাতায় আসতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে শিল্পপতি, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রবাসী ভারতীয় দিবস মূলত বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের সঙ্গে দেশের যোগাযোগ আরও দৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ এবং ভারত সরকারের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো, তাঁদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করাই অন্যতম লক্ষ্য। ২০০৩ সালে এই অনুষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল। পরে ২০১৫ সাল থেকে মূল সম্মেলনটি দু’বছর অন্তর আয়োজনের রীতি চালু হয়।
প্রবাসী ভারতীয় দিবস পালনের জন্য ৯ জানুয়ারি দিনটিকে বেছে নেওয়ার পিছনেও রয়েছে ঐতিহাসিক কারণ। ১৯১৫ সালের ৯ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে এসেছিলেন। পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার সঙ্গে এই দিনটি ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত হয়ে যায়। সেই দিনটির স্মরণেই প্রতি বছর প্রবাসী ভারতীয় দিবস পালনের রীতি গড়ে উঠেছে।
২০২৫ সালের ১৮তম প্রবাসী ভারতীয় দিবস সম্মেলন হয়েছিল ওড়িশার ভুবনেশ্বরে। ৮ থেকে ১০ জানুয়ারি আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সম্মেলনের মূল বিষয় ছিল ‘Diaspora’s contribution to a Viksit Bharat’। অর্থাৎ দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা ভারতীয় সম্প্রদায়ের ভূমিকার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এবার সেই আন্তর্জাতিক পরিসরের অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব পশ্চিমবঙ্গে আসতে চলেছে। নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা ভারতীয়দের সংগঠন ও কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো এবং সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে শেষ পর্যন্ত কতজন প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন, তা নিবন্ধন এবং আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে।
পশ্চিমবঙ্গে এই সম্মেলন আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে বিনিয়োগ। রাজ্য সরকারের তরফে বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের সামনে বাংলায় শিল্প, ব্যবসা, পর্যটন, প্রযুক্তি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রবাসী ভারতীয় শিল্পপতি এবং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বাংলার ব্যবসায়ী মহলের যোগাযোগ তৈরি করার সুযোগও হতে পারে।
বিশেষ করে শিল্প ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে বিভিন্ন দেশের শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং শিক্ষাবিদ রয়েছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক যোগাযোগকে রাজ্যের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য এই ধরনের সম্মেলন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে। তবে এই সম্মেলনের ফলে নির্দিষ্ট কত পরিমাণ বিনিয়োগ আসবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
রাজ্যের পর্যটন ও সংস্কৃতিকেও এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। সম্প্রতি রাজ্য সরকার এবং আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার মধ্যে ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়ন নিয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে। রাজ্যের পর্যটন দফতর জানিয়েছে, বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থানকে পর্যটন সার্কিটের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শোয়ের মতো উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রবাসী ভারতীয় দিবসেও বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরার কথা জানানো হয়েছে।
কলকাতাকে কেন্দ্র করে এই আয়োজন হলে শহরের পর্যটন ক্ষেত্রও এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ভারতীয় জাদুঘর, হাওড়া ব্রিজ, গঙ্গার ঘাট, বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপত্য এবং বাংলার দুর্গাপুজো ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক অতিথিদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলার খাবার, হস্তশিল্প, সংগীত ও শিল্পকলাকেও অনুষ্ঠানের অংশ করা হতে পারে।
প্রবাসী ভারতীয় দিবসের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আদানপ্রদান। কেন্দ্রীয় সরকারের বিবরণ অনুযায়ী, এই সম্মেলনে সাধারণত প্রবাসী যুবসমাজ, দক্ষতা, প্রযুক্তি, পরিবেশ, নারী নেতৃত্ব এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগের মতো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ফলে পশ্চিমবঙ্গে সম্মেলন হলে রাজ্যের শিক্ষাবিদ, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং তরুণ প্রজন্মের সঙ্গেও বিদেশে থাকা ভারতীয়দের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এই আয়োজন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে রাজ্য প্রশাসনের সূত্র উদ্ধৃত করে কেন্দ্র ও রাজ্যে একই রাজনৈতিক দলের সরকার থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে এবং এর ফলে রাজ্যের জন্য বিভিন্ন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে প্রশাসনিক মহলের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটি একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যা; প্রবাসী ভারতীয় দিবসের সরকারি উদ্দেশ্য হিসেবে কেন্দ্রীয় নথিতে মূলত প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ, তাঁদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব তৈরির কথাই বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গে প্রবাসী ভারতীয় দিবসের আয়োজন হলে তা রাজ্যের জন্য একটি বড় আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা ভারতীয়দের একাংশ কলকাতায় এলে তাঁদের সামনে বাংলার শিল্প, সংস্কৃতি, পর্যটন ও ব্যবসার সম্ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ থাকবে। একইসঙ্গে প্রবাসী ভারতীয়দের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রাজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করার পথও খুলতে পারে। তবে সম্মেলনের চূড়ান্ত অতিথি তালিকা, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা, অনুষ্ঠানস্থল এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত নির্দিষ্ট পরিকল্পনা পরবর্তী পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।


