বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে ঘিরে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে আওয়ামি লিগের একাংশ। শুক্রবার রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দলটির কর্মী-সমর্থকদের মিছিলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায়। পুলিশ জানিয়েছে, রাজধানীর একাধিক জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে অগ্নিসংযোগ এবং অন্যান্য নাশকতার ঘটনার পর ব্যাপক অভিযান চালানো হয়েছে। শনিবার পর্যন্ত এই অভিযানে মোট **৫১৫ জনকে গ্রেপ্তার** করা হয়েছে বলে ঢাকা পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ৪৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার পর শেখ হাসিনা ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর আগেও তিনি দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। জুলাইয়ে জাপানের কিয়োদো নিউজকে দেওয়া এক লিখিত সাক্ষাৎকারে হাসিনা জানিয়েছিলেন, তিনি বাংলাদেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। কারাবাস কিংবা মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি থাকলেও দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবেন না বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
হাসিনার এই ঘোষণার পর নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে তৎপরতা দেখা দিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শুক্রবার ঢাকার গুলশান এলাকায় দলটির সঙ্গে যুক্ত কয়েকশো কর্মী-সমর্থক মিছিল করেন। পুলিশ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, মিছিল থেকে সরকারবিরোধী স্লোগান দেওয়া হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস বা রাবার বুলেট ব্যবহারের পাশাপাশি অভিযান চালায় বলে সংবাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
### গুলশানের মিছিল ঘিরে উত্তেজনা
শুক্রবার গুলশানে হওয়া মিছিলটি ছিল এবারের ঘটনাপ্রবাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামি লিগ ও ছাত্রলিগের প্রায় ২০০ জন নেতা-কর্মী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মিছিল চলাকালীন পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল বোমা ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। পুলিশ পাল্টা রাবার বুলেট ছোড়ে। পরে ওই মিছিলের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে **১৭৯ জনকে গ্রেপ্তার** করা হয়।
তবে গ্রেপ্তারের সংখ্যা শুধুমাত্র ওই মিছিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণ এবং বাসে আগুন লাগানোর ঘটনার পর পুলিশ যে সামগ্রিক অভিযান চালায়, তাতেই মোট ৫১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে। এই সংখ্যার মধ্যে গুলশানের মিছিল-পরবর্তী গ্রেপ্তারও অন্তর্ভুক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, রাজধানীর সাত থেকে আটটি জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণ এবং নাশকতার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন ঘটনায় বাসে অগ্নিসংযোগের অভিযোগও সামনে এসেছে। ঘটনাগুলির তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার কাজ চলছে বলে জানিয়েছে ঢাকা পুলিশ।
### ২৫০ জায়গায় চেকপোস্ট, উদ্ধার অস্ত্র
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঢাকা শহরের প্রবেশপথ-সহ গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলিতে অতিরিক্ত নজরদারি শুরু হয়েছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় **২৫০টি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় চেকপোস্ট** বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশের দাবি, অভিযানে কয়েকজনের কাছ থেকে অস্ত্র ও অন্যান্য নিষিদ্ধ সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার সামগ্রীর তালিকায় রয়েছে দুটি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ১০ রাউন্ড গুলি এবং আটটি ধারালো অস্ত্র। এর পাশাপাশি বিস্ফোরক এবং মাদকও উদ্ধার হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এই ঘটনার পর রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে শহরের প্রবেশ ও বেরনোর পথগুলিতে তল্লাশি বাড়ানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজের পাশাপাশি অন্যান্য গোয়েন্দা তথ্যও ব্যবহার করছে বলে জানানো হয়েছে।
### নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগের নতুন করে সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর আওয়ামি লিগের সাংগঠনিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার দলটিকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এর পর থেকে দলটির প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
তবে হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর দলের একাংশ ফের সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। আল জাজিরার একটি প্রতিবেদনে আওয়ামি লিগের কয়েকজন নেতার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, হাসিনার ফেরার ঘোষণায় দলের কর্মীদের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে পুনর্গঠিত হওয়ার আগ্রহ দেখা দিয়েছে। একজন সিনিয়র নেতা জানিয়েছিলেন, নেত্রী দেশে ফিরলে তাঁরা আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসবেন।
অর্থাৎ, হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব আওয়ামি লিগের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনায় পড়েছে। দলের কর্মী-সমর্থকদের একাংশ প্রকাশ্যে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
### হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতের বাইরে থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য ও বার্তা দিয়ে আসছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কিয়োদো নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে তিনি বাংলাদেশে ফিরতে চান এবং আদালতের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে কারাগারে পাঠানো বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে যাবেন না।
তবে তাঁর দেশে ফেরাকে ঘিরে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত প্রকাশ্যে জানান, হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। তিনি হাসিনাকে দ্রুত দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানান এবং আদালতে বিচারপ্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেন।
ফলে হাসিনার ঘোষিত প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—তিনি দেশে ফিরলে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে এবং আওয়ামি লিগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ কী হবে।
### ১২ জনকে গ্রেপ্তার ঘিরে আলাদা তদন্ত
এর মধ্যেই ঢাকার ফার্মগেট এলাকার তেজগাঁও কলেজ জামে মসজিদে একটি কথিত গোপন বৈঠককে কেন্দ্র করে আরও ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে জঙ্গি কার্যকলাপ এবং দেশে অস্থিরতা তৈরির উদ্দেশ্যে লোক সংগ্রহের সন্দেহের কথা জানিয়েছে। তারা ‘মিটআপ’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সদস্য বলে পুলিশ জানিয়েছে।
আদালত ওই ১২ জনকে তিন দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছে বলে সংবাদ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনাটি আওয়ামি লিগের মিছিল-সংক্রান্ত ঘটনার থেকে আলাদা একটি তদন্ত হিসেবে সামনে এসেছে। ফলে একই সময়ে ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক স্তরে তদন্ত চলছে।
### সামনে বড় রাজনৈতিক ও আইনি প্রশ্ন
হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পর আওয়ামি লিগের কর্মীদের একাংশের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক তৎপরতার খবর সামনে এলেও দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও একাধিক প্রশ্ন রয়েছে। একদিকে রয়েছে দলটির উপর নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে হাসিনার বিরুদ্ধে চলমান বিচারপ্রক্রিয়া এবং তাঁর দেশে ফেরার ঘোষণা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণেও এই বিষয়টি উঠে এসেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামি লিগের কিছু নেতা হাসিনার ঘোষণায় উৎসাহিত হলেও ২০২৪ সালের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক নেতাদের একটি অংশ তাঁর দেশে ফেরার ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়টি সামনে রাখছে। অর্থাৎ, তাঁর প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান রয়েছে।
এদিকে ২০ সেপ্টেম্বরের আরও একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামি লিগের পক্ষ থেকে নয় দফা দাবি ও প্রস্তাব সামনে আনা হয়েছে। এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো, বিদ্যুৎ-জ্বালানি-গ্যাস ও সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা, বন্ধ শিল্প পুনরায় চালু করা এবং দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি রয়েছে।
ফলে শুক্রবারের মিছিল ও ব্যাপক গ্রেপ্তারের ঘটনাকে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি বড় পর্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে। হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণায় আওয়ামি লিগের একাংশের প্রকাশ্য তৎপরতা বাড়লেও, দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভবিষ্যৎ এবং হাসিনার প্রত্যাবর্তনের পর সম্ভাব্য আইনি প্রক্রিয়া—দুটি বিষয়ই এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


