রাখিবন্ধন উৎসবের মঞ্চ থেকেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে নিশানা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার ভবানীপুর বিধানসভায় রাখিবন্ধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে ‘রেড স্যালুট কিষানজি’ লেখার প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। পাশাপাশি কলকাতার রাস্তায় ‘আজাদি’ স্লোগান ওঠা নিয়েও তীব্র আপত্তি জানান মুখ্যমন্ত্রী।
শুভেন্দুর বক্তব্যে উঠে আসে দেশপ্রেম, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং দেশের অভ্যন্তরে ‘দেশবিরোধী’ কার্যকলাপের অভিযোগ। তাঁর কথায়, বাইরে থেকে আসা শত্রুর মোকাবিলায় দেশের সেনাবাহিনী রয়েছে, কিন্তু দেশের ভিতরেও এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, যাঁরা দেশকে দুর্বল করার চেষ্টা করেন।
## রাখির মঞ্চে যাদবপুর প্রসঙ্গ
শুক্রবার ভবানীপুর বিধানসভায় রাখিবন্ধন উৎসবে যোগ দেন শুভেন্দু অধিকারী। সেখানেই বক্তৃতার সময় দেশের স্বাধীনতা এবং বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের অবদানের কথা তুলে ধরেন তিনি।
এরপরই তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে চলে আসে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেওয়ালে কেন মাওবাদী নেতা কিষানজিকে উদ্দেশ্য করে ‘রেড স্যালুট কিষানজি’ লেখা থাকবে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
শুভেন্দুর বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ধরনের লেখা পড়ুয়াদের মধ্যে কী ধরনের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে, সেটিই তাঁর উদ্বেগের বিষয়।
## ‘রেড স্যালুট কিষানজি’ নিয়ে প্রশ্ন
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে ‘রেড স্যালুট কিষানজি’ লেখাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। সেই প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু প্রশ্ন করেন, কিষানজি কে এবং নতুন প্রজন্মকে এই ধরনের বার্তার মাধ্যমে কী শেখানো হচ্ছে।
তিনি কিষানজির রাজনৈতিক অবস্থান ও অতীত কার্যকলাপের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, যিনি ভোট বয়কটের কথা বলেছিলেন এবং সংবিধান মানতেন না, তাঁকে কেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেওয়ালে স্যালুট জানানো হবে।
তবে মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য মূলত তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও অভিযোগের ভিত্তিতে করা মন্তব্য। এই বিষয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থী বা কর্তৃপক্ষের একই মত রয়েছে—এমন দাবি করা যায় না।
## ‘কী শেখাচ্ছেন আগামী প্রজন্মকে?’
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন।
তাঁর মতে, দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেওয়ালে এমন কোনও বার্তা থাকা উচিত নয়, যা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশের সাংবিধানিক কাঠামো বা জাতীয় ঐক্য নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে।
এই প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, আগামী প্রজন্মকে আসলে কী শেখানো হচ্ছে।
## কলকাতার রাস্তায় ‘আজাদি’ স্লোগান নিয়েও ক্ষোভ
শুধু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নয়, কলকাতার রাস্তায় ‘আজাদি’ স্লোগান ওঠার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন শুভেন্দু।
তিনি প্রশ্ন করেন, দেশ যখন স্বাধীন, তখন আবার ‘কীসের আজাদি’ চাওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে ‘কাশ্মীর মাগে আজাদি’-র মতো স্লোগানের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
শুভেন্দুর বক্তব্যে স্পষ্ট, এই ধরনের স্লোগানকে তিনি দেশের অখণ্ডতা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছেন।
## ‘দেশের ভিতরেও অনেকে আছে’
বক্তব্যে দেশের বাইরের শত্রুদের প্রসঙ্গও তোলেন মুখ্যমন্ত্রী।
তাঁর দাবি, দেশের বাইরে থেকে আসা শত্রুদের মোকাবিলা করার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী রয়েছে। তিনি ভারতীয় বায়ুসেনার সামরিক অভিযানের কথাও উল্লেখ করেন।
তবে তাঁর বক্তব্যের মূল রাজনৈতিক বার্তা ছিল, দেশের ভিতরেও এমন কিছু শক্তি রয়েছে যারা ভারতকে দুর্বল করার চেষ্টা করে।
## ‘বন্দে মাতরম’ ও ‘জনগণমন’ নিয়েও মন্তব্য
রাখিবন্ধনের অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত ও জাতীয় গানের প্রসঙ্গও উঠে আসে।
শুভেন্দু অভিযোগ করেন, কিছু মানুষ ‘জনগণমন অধিনায়ক’ এবং ‘বন্দে মাতরম’-কে অপমান করেন। তাঁর বক্তব্য, দেশপ্রেমের আবহে এই ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, যারা দেশের ভিতর থেকে আক্রমণ করে বলে তিনি মনে করেন, তাদের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে সচেতন হওয়ার শপথ নেওয়া উচিত।
## ‘বাড়ির আবর্জনার মতো পরিষ্কার’
বক্তব্যের সবচেয়ে তীব্র অংশ ছিল ‘আবর্জনা’ প্রসঙ্গ।
শুভেন্দু বলেন, দেশপ্রেমের রাখিবন্ধনে এমন মানুষদের ‘বাড়ির আবর্জনার মতো পরিষ্কার’ করার শপথ নিতে হবে, যারা তাঁর মতে দেশের ভিতর থেকে আক্রমণ করে।
এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ ‘দেশবিরোধী’ বা ‘দেশের ভিতরের শত্রু’ হিসেবে কাদের চিহ্নিত করা হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে মতভেদ রয়েছে।
## যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন নয়
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরেই বাংলার রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক ইস্যু।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি, বামপন্থী রাজনীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জাতীয়তাবাদ এবং প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক হয়েছে।
ফলে শুভেন্দুর সাম্প্রতিক মন্তব্যকে সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক বিতর্কেরই একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
## স্বাধীনতা বনাম মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
এই ঘটনায় একটি বড় প্রশ্নও সামনে এসেছে—শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের সীমা কোথায়?
একদিকে জাতীয় ঐক্য, সংবিধান এবং দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত চিন্তা, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ এবং বিতর্কের জায়গা হিসেবে দেখার পক্ষেও যুক্তি রয়েছে।
এই দুই অবস্থানের সংঘাতই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ককে বারবার সামনে নিয়ে আসে।
## রাখিবন্ধনের বার্তায় দেশপ্রেম
শুভেন্দুর বক্তব্যের সামগ্রিক বিষয়বস্তু ছিল দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্য। রাখিবন্ধনের মতো একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মঞ্চকে তিনি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, জাতীয় নিরাপত্তা এবং দেশপ্রেমের সঙ্গে যুক্ত করেন।
বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান এবং দেশের জন্য আত্মত্যাগের কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
## রাজনৈতিক তরজা আরও বাড়ার সম্ভাবনা
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে শুভেন্দুর এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক তরজা আরও বাড়তে পারে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়টি বরাবরই পশ্চিমবঙ্গের ছাত্র রাজনীতি এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্র।
বিশেষ করে ‘রেড স্যালুট কিষানজি’, ‘আজাদি’ স্লোগান এবং ‘দেশবিরোধী’ কার্যকলাপের মতো বিষয় সামনে আসায় বিজেপি ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে নতুন করে চাপানউতোর তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
## শেষ কথা
রাখিবন্ধন উৎসবের মঞ্চ থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের অভ্যন্তরে ‘দেশবিরোধী’ কার্যকলাপের অভিযোগ নিয়ে সরব হলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। যাদবপুরের দেওয়ালে ‘রেড স্যালুট কিষানজি’ লেখা এবং কলকাতার রাস্তায় ‘আজাদি’ স্লোগানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি তীব্র সমালোচনা করেন।
তাঁর বক্তব্যে জাতীয় ঐক্য, সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা এবং দেশপ্রেমের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। একইসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন বার্তা নতুন প্রজন্মকে কী শেখাচ্ছে।
তবে এই মন্তব্যের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং জাতীয়তাবাদের সীমা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


