সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াধে শনিবার তৈরি হল নতুন করে আতঙ্কের পরিস্থিতি। শহরের প্রধান বিমানবন্দর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে আগুন এবং ঘন কালো ধোঁয়ার বিশাল স্তম্ভ দেখা যায়। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই সৌদি কর্তৃপক্ষ রাজধানী রিয়াধ এবং সংলগ্ন এলাকায় সম্ভাব্য আকাশপথে হামলার সতর্কবার্তা জারি করেছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনার কথাও জানিয়েছেন। এর মধ্যেই ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী দাবি করেছে, তারা রিয়াধের একাধিক ‘সংবেদনশীল’ লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ঘটনার পর রিয়াধের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। যদিও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, রিয়াধের দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। একইসঙ্গে দেশের অন্য কয়েকটি এলাকায় হামলার চেষ্টা নস্যাৎ করার দাবিও করেছে জোট। এখনও পর্যন্ত রিয়াধের বিমানবন্দর এলাকায় আগুন ও ধোঁয়ার সঙ্গে হামলার সুনির্দিষ্ট যোগসূত্র নিয়ে সব তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। তবে ঘটনাগুলি একই সময়ে ঘটায় বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
### বিমানবন্দরের কাছে দেখা গেল আগুন
রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শী এবং ছবি ও ভিডিও-ভিত্তিক প্রতিবেদনে জানা যায়, শনিবার রিয়াধের প্রধান বিমানবন্দরের কাছে আকাশে বিশাল কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। ধোঁয়ার পাশাপাশি আগুনের শিখাও দেখা গিয়েছে। বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় জ্বালানি সংরক্ষণের ট্যাঙ্কের মতো কাঠামোর পিছন থেকে আগুন উঠতে দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে রিপোর্টে জানানো হয়েছে।
এএফপির সাংবাদিকের দেখা তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে দমকলকর্মীদের আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। একটি জ্বালানি ট্যাঙ্কে আগুন লেগেছিল বলে পৃথক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ট্যাঙ্কে সৌদি রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা আরামকোর চিহ্ন ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়। তবে আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে প্রথম দিকে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটেছে যখন সৌদি আরব এবং ইয়েমেনের হুথিদের মধ্যে সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে। ফলে বিমানবন্দরের কাছে আগুনের ঘটনা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি হয়।
### হামলার সতর্কবার্তা জারি করেছিল সৌদি আরব
আগুন ও ধোঁয়া দেখা যাওয়ার আগে সৌদি সিভিল ডিফেন্স রিয়াধ এবং রাজধানীর পূর্বদিকে অবস্থিত আল-খারজ এলাকায় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠায়। নাগরিকদের সম্ভাব্য আকাশপথে হামলার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়। পরে শনিবার সকালে কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে ‘অল ক্লিয়ার’ বার্তা দেয়।
রয়টার্সের এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, রিয়াধের ওলায়া এলাকায় তিনি বিস্ফোরণের মতো শব্দ শুনেছিলেন। অন্য বাসিন্দারাও রাজধানীর বিভিন্ন অংশ থেকে বিস্ফোরণসদৃশ শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন। এর পরেই বিমানবন্দরের দিক থেকে কালো ধোঁয়া এবং আগুন দেখা যায়।
উল্লেখযোগ্যভাবে, চলতি বছর আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রিয়াধে কিছু সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছিল। কিন্তু জুলাইয়ে হুথিদের সঙ্গে সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার পর এ ধরনের সতর্কতা এবারই প্রথম জারি করা হয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
### রিয়াধে হামলার দাবি হুথিদের
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী দাবি করে, তারা সৌদি রাজধানী রিয়াধের ‘সংবেদনশীল’ এলাকাগুলিতে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে। তবে তারা রিয়াধের ঠিক কোন কোন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে জানায়নি। পাশাপাশি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেলকেন্দ্র ইয়ানবুতে আরামকোর একটি স্থাপনাতেও হামলা চালানোর দাবি করেছে তারা।
হুথিদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের রাজধানী সানায় সৌদি হামলার প্রতিক্রিয়াতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। তবে হুথিদের করা বিভিন্ন হামলার দাবির সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, হুথিদের ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রিয়াধের দিকে যাওয়ার সময় প্রতিহত করা হয়। একই বিবৃতিতে সৌদি জোট জানিয়েছে, দেশের আরও কয়েকটি শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টাও ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে।
### বিমান পরিষেবাতেও প্রভাব
রিয়াধ বিমানবন্দরের কাছে আগুন এবং ধোঁয়ার ঘটনা বিমান পরিষেবাতেও প্রভাব ফেলেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট FlightRadar24 বিমানবন্দরে বড় ধরনের পরিষেবা বিঘ্নের কথা জানিয়েছে। একাধিক উড়ান বাতিল এবং দেরির খবরও সামনে এসেছে।
King Khalid International Airport সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর। দেশটির রাজধানীতে আন্তর্জাতিক যাত্রী ও পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে এই বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে বিমানবন্দরের আশপাশে কোনও নিরাপত্তাজনিত ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব সরাসরি বিমান পরিষেবায় পড়তে পারে।
তবে বিমানবন্দরের সমস্ত পরিষেবা কতটা এবং কত সময়ের জন্য ব্যাহত হয়েছিল, সে বিষয়ে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যক বাতিল বা বিলম্বিত উড়ানের হিসাব সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থা বা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পরবর্তী তথ্যের উপর নির্ভর করবে।
### সৌদি আরব-হুথি সংঘাত কেন বাড়ছে?
রিয়াধের সাম্প্রতিক ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন সৌদি আরব এবং হুথিদের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। হুথিরা ইয়েমেনের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলিতে হুথিদের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের শহর, জ্বালানি পরিকাঠামো এবং লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্য করে হামলার হুমকি ও অভিযান বেড়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। জুলাই থেকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে।
হুথিদের দাবি, সৌদি আরবের পদক্ষেপের জবাব হিসেবেই তারা এই হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে সৌদি আরব এবং আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ হুথিদের হামলাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে।
### লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ নিয়েও উদ্বেগ
এই সংঘাতের প্রভাব শুধু সৌদি আরব বা ইয়েমেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। লোহিত সাগর এবং বাব-আল-মান্দাব প্রণালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ এবং এশিয়ায় তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে এই সমুদ্রপথের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের হামলার ফলে সৌদি শহর ও জ্বালানি পরিকাঠামোর পাশাপাশি জাহাজ চলাচলও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এতে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের উপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র ইয়ানবুকে ঘিরে হুথিদের হামলার দাবিও পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। যদিও হুথিদের দাবি করা ক্ষয়ক্ষতির সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
### রাষ্ট্রসংঘের উদ্বেগ
সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হুথিদের ধারাবাহিক হামলার বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নিরাপত্তা পরিষদ সৌদি আরবের বেসামরিক এবং জ্বালানি পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করে হুথিদের হামলার নিন্দা করেছে। এসব হামলায় নারী ও শিশুসহ সাধারণ মানুষ আহত হয়েছে বলেও রাষ্ট্রসংঘের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ইয়েমেনে হুথিদের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধিরও নিন্দা করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে রিয়াধের বিমানবন্দরের কাছে আগুন এবং কালো ধোঁয়ার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান নিরাপত্তা সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। একদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য আকাশপথে হামলার সতর্কতা জারি করেছে, অন্যদিকে হুথিরা রিয়াধে হামলার দাবি করেছে। সৌদি জোট আবার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে।
তবে বিমানবন্দরের কাছে ঠিক কী কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত, সে বিষয়ে ঘটনার পরপরই সমস্ত তথ্য স্পষ্ট ছিল না। তাই হামলার সঙ্গে আগুনের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক এবং বিমানবন্দরের পরিকাঠামোর উপর প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে আরও সরকারি তথ্যের অপেক্ষা রয়েছে। এদিকে আন্তর্জাতিক মহল নজর রাখছে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে এই নতুন করে বাড়তে থাকা সংঘাতের দিকে।


