বাঁকুড়ার তালডাংরার তৃণমূল কর্মী মদন খান খুনের মামলায় বড়সড় মোড়। নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা পাওয়া প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক মনোরঞ্জন পাত্র-সহ তিন নেতাকে বেকসুর খালাস করল কলকাতা হাই কোর্ট। শুক্রবার বিচারপতি দেবাংশু বসাকের এজলাসে মামলাটির শুনানি হয়। তথ্যপ্রমাণ এবং সাক্ষীদের বয়ান খতিয়ে দেখার পর আদালত তিনজনকেই নির্দোষ ঘোষণা করে। ফলে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর স্বস্তি পেলেন মনোরঞ্জন পাত্র, জিতেন পাত্র এবং আজবাহার খান। রায় ঘোষণার পর তিনজনই আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
এই মামলার সূত্রপাত প্রায় ১৬ বছর আগে। ২০১০ সালের ২৯ জুন বাঁকুড়ার তালডাংরা বিধানসভা এলাকার রাজপুর গ্রামে তৃণমূল কর্মী মদন খানকে খুন করা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, বাড়িতে ঢুকে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। ঘটনার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং পরদিন মৃতের ছেলে ইসমাইল খান তালডাংরা থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।
তদন্তের পর এই হত্যাকাণ্ডে তৎকালীন সিপিএম বিধায়ক মনোরঞ্জন পাত্রের নাম উঠে আসে। তাঁর পাশাপাশি সিপিএম নেতা জিতেন পাত্র এবং আজবাহার খান-সহ মোট ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। মামলাটি পরবর্তীতে বিধাননগরের এমপি-এমএলএ আদালতে ওঠে। রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মামলায় একদিকে যেমন তৃণমূল কর্মী খুনের অভিযোগ ছিল, তেমনই অভিযুক্তদের মধ্যে তৎকালীন বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একাধিক পরিচিত নেতার নাম থাকায় বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক মহলেও আলোচনায় ছিল।
পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালে রাজনৈতিক পালাবদলের পর তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে। সেই সময় মনোরঞ্জন পাত্র জামিনে ছিলেন। এরপর মামলার বিচারপ্রক্রিয়া চলতে থাকে। হত্যাকাণ্ডের এক দশকেরও বেশি সময় পরে, ২০২২ সালে নিম্ন আদালত এই মামলার রায় ঘোষণা করে। সেই রায়ে মনোরঞ্জন পাত্র, জিতেন পাত্র এবং আজবাহার খানকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং তিনজনকেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দেওয়া হয়েছিল।
নিম্ন আদালতের সেই রায়ের পরই শুরু হয় নতুন আইনি লড়াই। তিন সিপিএম নেতা কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন এবং নিম্ন আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করেন। তাঁদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ভিত্তি যথেষ্ট নয় এবং মামলাটি সঠিকভাবে বিচার করা হয়নি। মামলার শুনানি দীর্ঘ সময় ধরে চলে। এদিকে প্রাক্তন বিধায়ক মনোরঞ্জন পাত্র জামিনে মুক্ত ছিলেন।
হাই কোর্টে মামলার শুনানির সময় মূলত তথ্যপ্রমাণ এবং সাক্ষীদের বয়ান গুরুত্ব পায়। নিম্ন আদালতের রায়ে যে প্রমাণের ভিত্তিতে তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, সেগুলিই ফের খতিয়ে দেখে উচ্চ আদালত। শেষ পর্যন্ত সেই প্রমাণ ও সাক্ষ্যগ্রহণের ভিত্তিতে কলকাতা হাই কোর্ট তিন অভিযুক্তকেই নির্দোষ ঘোষণা করে। ফলে ২০২২ সালের যাবজ্জীবন সাজা কার্যত বাতিল হয়ে গেল।
শুক্রবারের রায় ঘোষণার সময় মনোরঞ্জন পাত্র, জিতেন পাত্র এবং আজবাহার খান তিনজনই আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় তাঁদের পক্ষে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলার পর উচ্চ আদালতের এই সিদ্ধান্ত তাঁদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন সাজা পাওয়ার পর হাই কোর্ট থেকে বেকসুর খালাস তাঁদের আইনি অবস্থানে বড় পরিবর্তন আনল।
রায়ের পর মনোরঞ্জন পাত্র বলেন, প্রথম থেকেই তাঁরা মামলাটিকে মিথ্যা বলে দাবি করে এসেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হাই কোর্টের রায়ে সেই দাবিই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর আদালতের সিদ্ধান্তকে তিনি ন্যায়বিচার হিসেবে দেখছেন। জিতেন পাত্রও জানান, দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরে তাঁরা ন্যায়বিচার পেয়েছেন। অন্যদিকে আজবাহার খান জেলবন্দি থাকার যন্ত্রণার কথা উল্লেখ করে জানান, হাই কোর্টের রায়ে তাঁরা স্বস্তি পেয়েছেন।
এই রায়কে ঘিরে বাঁকুড়া জেলা সিপিএম নেতৃত্বের মধ্যেও খুশির আবহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলায় দলের তিন নেতার বিরুদ্ধে নিম্ন আদালতের রায় নিয়ে সিপিএমের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। উচ্চ আদালতে সেই রায় বদলে যাওয়ায় দলের স্থানীয় নেতৃত্বও স্বস্তি পেয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
তবে এই মামলার গুরুত্ব শুধুমাত্র তিন নেতার খালাস পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। ২০১০ সালে রাজ্যে তখনও বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় ছিল এবং মনোরঞ্জন পাত্র ছিলেন তৎকালীন বিধায়ক। পরের বছরই রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। ফলে এই মামলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
তালডাংরার রাজপুর গ্রামের মদন খান খুনের ঘটনা সেই সময় এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। যদিও আদালতে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, সেটিই শেষ পর্যন্ত আইনি বিচারের মূল বিষয়। নিম্ন আদালতের দোষী সাব্যস্ত করার সিদ্ধান্তের পর হাই কোর্টে সেই প্রমাণ পুনরায় পর্যালোচনা করা হয়। শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালত তিনজনকে খালাস দিয়েছে।
আইনি দিক থেকেও এই রায় গুরুত্বপূর্ণ। নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর কোনও অভিযুক্ত উচ্চ আদালতে সেই রায়ের বিরুদ্ধে আবেদন করতে পারেন। সেই আপিলের শুনানিতে নিম্ন আদালতের প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং মামলার বিভিন্ন দিক পুনরায় পর্যালোচনা করা হয়। এই মামলাতেও একই প্রক্রিয়ায় তিন সিপিএম নেতার বিরুদ্ধে দেওয়া আগের রায় খতিয়ে দেখা হয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই মামলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল বিচারপ্রক্রিয়ার সময়কাল। ২০১০ সালে খুনের ঘটনা, ২০২২ সালে নিম্ন আদালতের রায় এবং ২০২৬ সালে কলকাতা হাই কোর্টের রায়—পুরো আইনি লড়াইটি প্রায় ১৬ বছর ধরে চলল। এত দীর্ঘ সময় ধরে চলা একটি ফৌজদারি মামলায় উচ্চ আদালতের রায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে আদালতের রায়ের পরও এই মামলাকে ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনা থামার সম্ভাবনা কম। কারণ অভিযুক্তরা প্রত্যেকেই সিপিএমের সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁদের মধ্যে মনোরঞ্জন পাত্র একসময় তালডাংরা বিধানসভার বিধায়ক ছিলেন। অন্যদিকে নিহত মদন খান ছিলেন তৃণমূল কর্মী। ফলে মামলার রাজনৈতিক অভিঘাতও রয়েছে।
সব মিলিয়ে, মদন খান হত্যা মামলায় কলকাতা হাই কোর্টের রায়ে বড় পরিবর্তন এল। ২০২২ সালে নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক মনোরঞ্জন পাত্র, নেতা জিতেন পাত্র এবং আজবাহার খান শুক্রবার বেকসুর খালাস পেলেন। তথ্যপ্রমাণ ও সাক্ষীদের বয়ান পর্যালোচনা করার পর বিচারপতি দেবাংশু বসাকের এজলাসে এই সিদ্ধান্ত হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর তিন নেতাই স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।


