বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির পর দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বিপুল অঙ্কের টাকা জমা পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৩৭০ কোটি টাকার এই লেনদেনকে ঘিরেই এবার নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এত বড় অঙ্কের টাকা কোথা থেকে এল, কেন নির্বাচনের পর এই অর্থ অ্যাকাউন্টে জমা পড়ল এবং কী উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করা হয়েছে—এই সমস্ত প্রশ্ন সামনে এনে তদন্ত ও অডিটের দাবি তুলেছে তৃণমূলেরই একাংশ।
বিষয়টি ঘিরে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আরও প্রকাশ্যে এসেছে। ‘কালীঘাট তৃণমূল’ এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘আসল’ তৃণমূলের মধ্যে দলের প্রতীক, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক তহবিল নিয়ে ইতিমধ্যেই টানাপোড়েন চলছে। সেই আবহেই দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা জমার অভিযোগ নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ঋতব্রত শিবিরের দাবি, এত বড় অঙ্কের অর্থের উৎস ও ব্যবহার স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে কালীঘাট তৃণমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। দলের একাধিক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই আর্থিক লেনদেন নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর আগে দলের তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছিল। সেই অ্যাকাউন্টগুলি ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে কালীঘাট তৃণমূল আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল। বিষয়টি কলকাতা হাই কোর্ট হয়ে আইনি লড়াইয়ের আরও বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছেছে।
নতুন অভিযোগের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচনে পরাজয়ের পরেও কীভাবে দলের অ্যাকাউন্টে এত বিপুল অর্থ জমা পড়ল। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, নির্বাচনের আগে ও পরে দলের আর্থিক লেনদেনের সম্পূর্ণ হিসাব খতিয়ে দেখা দরকার। শুধু জমা পড়া অর্থের উৎস নয়, সেই টাকা কোথায় এবং কীভাবে খরচ হয়েছে, তারও বিস্তারিত হিসাব সামনে আনার দাবি উঠেছে।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে অডিটের দাবি করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, দলের আর্থিক লেনদেন নিয়ে কোনও প্রশ্ন থাকলে তার উত্তর দিতে হলে ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট, লেনদেনের নথি এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে আদালতের কাছেও বিষয়টি নথিপত্র-সহ তুলে ধরা হবে বলে ওই শিবিরের তরফে জানানো হয়েছে।
এর পাশাপাশি দলের অফিস পরিচালনা এবং কর্মীদের বেতন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আদালতে চলা মামলায় কালীঘাট তৃণমূলের আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, দলের ২১টি কার্যালয়ের ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকা খরচ হত বলে দাবি করা হয়েছে। প্রায় ২৫০ জন কর্মীর বেতন বাবদ মাসে ৫১ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের কথাও আদালতে বলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এত বড় অঙ্কের অর্থ কীভাবে পরিশোধ করা হত, তার আর্থিক নথি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এই ব্যয়ের হিসাব ঘিরে আরও একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—এই বিপুল অর্থ কি নিয়মিত ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার মাধ্যমেই পরিশোধ করা হত, নাকি অন্য কোনও আর্থিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল? দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে এখন এই প্রশ্নগুলি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগকারীদের মতে, স্বচ্ছতার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সম্পূর্ণ লেনদেনের হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তবে ৩৭০ কোটি টাকা জমার অভিযোগ নিয়ে কালীঘাট তৃণমূলের পক্ষ থেকে এখনও বিস্তারিত ব্যাখ্যা সামনে আসেনি। ফলে অভিযোগের সত্যতা, অর্থের প্রকৃত উৎস এবং লেনদেনের উদ্দেশ্য নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে সংশ্লিষ্ট নথি ও ব্যাঙ্কের হিসাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক অভিযোগ এবং তদন্তে প্রমাণিত তথ্য—দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রাখাও এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
তৃণমূলের আর্থিক তহবিল নিয়ে বিতর্ক অবশ্য এই প্রথম নয়। গত মাসেও দলের অ্যাকাউন্টে ১৬৪ কোটি টাকার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। ওই অর্থের হিসাব চেয়ে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠানোর খবর সামনে আসে। তদন্তকারী সংস্থার নজরে ছিল তৃণমূলের মূল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের লেনদেনও।
এর আগে দলের তহবিল সংক্রান্ত তদন্তে একটি বিমান পরিষেবা সংস্থার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তদন্তকারীদের নজরে আসে, সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে তৃণমূলের সঙ্গে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। সেই সংস্থা একটি বিমান ও একটি অগুস্তা হেলিকপ্টার কেনার পর তৃণমূল নেতাদেরই ভাড়ায় পরিষেবা দিত বলে অভিযোগের প্রেক্ষিতে আর্থিক লেনদেনের প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
এদিকে দলের আর্থিক মামলায় কালীঘাট তৃণমূলের কোষাধ্যক্ষ তথা প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ শুভাশিস চক্রবর্তীকে ইডি তলবও করেছে। দলের তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের ‘সাইনিং অথরিটি’ হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল বলে তদন্তকারী সূত্রে জানানো হয়েছে। তাঁকে দলের অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি নিয়ে হাজির হতে বলা হয়েছিল।
তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের জেরে দলের আর্থিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও রাজনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কালীঘাট শিবির এবং ঋতব্রতপন্থী শিবিরের মধ্যে এই বিরোধের প্রভাব দলের প্রতীক ও সাংগঠনিক কাঠামোর পাশাপাশি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলিতেও পড়েছে। ফলে ৩৭০ কোটি টাকার অভিযোগ নতুন করে সেই দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে এসেছে।
অন্যদিকে, দলের একাধিক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও এই বিতর্ককে আরও জটিল করেছে। জুলাই মাসে কলকাতা হাই কোর্টে অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে মামলা হয়েছিল। আদালতের বিভিন্ন নির্দেশ ও পরবর্তী আইনি পরিস্থিতির কারণে কালীঘাট তৃণমূলের আর্থিক কার্যক্রম নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে, বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর তৃণমূলের অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা জমা পড়ার অভিযোগ এখন রাজ্য রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অর্থের উৎস কী, কখন এবং কীভাবে তা জমা হয়েছে, কী উদ্দেশ্যে সেই অর্থ রাখা বা ব্যবহার করা হয়েছিল—এই প্রশ্নগুলির উত্তর পাওয়ার জন্য নথিপত্র ও আর্থিক হিসাব খতিয়ে দেখা জরুরি। তদন্ত বা অডিটে প্রকৃত তথ্য সামনে এলে তবেই এই বিপুল অঙ্কের লেনদেনের আসল কারণ স্পষ্ট হবে।


