সাতসকালেই কলকাতায় ফের বড়সড় অভিযান এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডির। বুধবার সকালে দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ এবং নিউ আলিপুরের একাধিক ঠিকানায় একযোগে তল্লাশি শুরু করেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকরা। প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, বিদেশি মুদ্রা বিনিময়ের নামে বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়ম এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগের সূত্র ধরেই এই অভিযান। দুই ব্যবসায়ীর বাড়ি ও অফিসে তল্লাশি চালিয়ে তাঁদের সংস্থার নথিপত্র এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
ইডি সূত্রের দাবি, বিদেশি মুদ্রা বিনিময়ের সঙ্গে যুক্ত কিছু লেনদেন নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে তদন্তকারীদের মধ্যে। অভিযোগের পরিধি শুধু কলকাতাতেই সীমাবদ্ধ নয় বলেও প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে। তদন্তে এমন কিছু আর্থিক লেনদেনের হদিশ মিলেছে, যার সূত্র দেশের একাধিক প্রান্তে ছড়িয়ে থাকতে পারে। সেই কারণেই বুধবার দেশের বিভিন্ন শহরে একসঙ্গে তল্লাশি চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কলকাতা ছাড়াও দিল্লি ও বেঙ্গালুরু-সহ মোট ১৭টি জায়গায় একইসঙ্গে অভিযান চলছে বলে জানা গিয়েছে।
কলকাতায় যে দুটি জায়গায় এদিনের অভিযান বিশেষভাবে নজরে এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে বালিগঞ্জ এবং নিউ আলিপুর। তদন্তকারীরা সংশ্লিষ্ট দুই ব্যবসায়ীর বাড়ি ও অফিসে পৌঁছে বিভিন্ন নথি পরীক্ষা করছেন। ব্যবসায়িক সংস্থার আর্থিক হিসাব, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং বিদেশি মুদ্রা সংক্রান্ত লেনদেনের নথি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। কোনও নির্দিষ্ট লেনদেনের সঙ্গে বিদেশে অর্থ পাঠানোর যোগ রয়েছে কি না, থাকলে সেই অর্থের উৎস ও গন্তব্য কী—সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় থাকতে পারে।
তল্লাশি অভিযানের সময় কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদেরও মোতায়েন করা হয়। ভোরেই তদন্তকারীরা সংশ্লিষ্ট ঠিকানাগুলিতে পৌঁছে যান। বাড়ি এবং অফিসের ভিতরে নথিপত্র পরীক্ষা করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আর্থিক তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে বলে জানা গিয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত ইডির তরফে অভিযানে কী কী নথি বা সম্পদ উদ্ধার হয়েছে, কিংবা কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনও সরকারি ঘোষণা সামনে আসেনি। ফলে তদন্তের এই পর্যায়ে অভিযানের ফলাফল নিয়ে নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়।
বিদেশি মুদ্রা লেনদেন নিয়ে ইডির এই তৎপরতার গুরুত্ব রয়েছে কারণ বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত অনিয়মের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস, লেনদেনের বৈধতা এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের নিয়ম মানা হয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্ত করা হয়। যদি কোনও আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে বেআইনি অর্থের যোগ পাওয়া যায়, তখন সংশ্লিষ্ট আর্থিক নেটওয়ার্কের গতিপথ অনুসন্ধান করতে পারে তদন্তকারী সংস্থা। এদিনের অভিযানের ক্ষেত্রেও তদন্তকারীরা মূলত সেই আর্থিক পথের সন্ধান করছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে।
এর আগে সেপ্টেম্বর মাসেও কলকাতায় একাধিক জায়গায় ইডির অভিযান দেখা গিয়েছিল। ১৬ সেপ্টেম্বর চিটফান্ড সংক্রান্ত একটি তদন্তে কলকাতার ছ’টি ঠিকানায় তল্লাশি চালানো হয়েছিল। নারকেলডাঙা, নেতাজিনগর এবং রবীন্দ্র সরোবর-সহ বিভিন্ন এলাকায় ওই অভিযান হয়েছিল বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল। সেই তদন্তে চিটফান্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ নির্মাণ ব্যবসার মাধ্যমে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া বা অর্থের উৎস গোপন করার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
১৬ সেপ্টেম্বরের ওই অভিযানের সঙ্গে অবশ্য ২৩ সেপ্টেম্বরের বালিগঞ্জ ও নিউ আলিপুরের তল্লাশিকে একই তদন্তের অংশ বলে ধরে নেওয়ার মতো তথ্য এখনও প্রকাশ্যে নেই। বুধবারের অভিযানের ক্ষেত্রে বিদেশি মুদ্রা বিনিময়ের নামে আর্থিক অনিয়ম এবং অর্থ পাচারের অভিযোগই প্রাথমিক তদন্তের বিষয় বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তাই দুই অভিযানের মধ্যে সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, তা তদন্ত এগোলেই স্পষ্ট হতে পারে।
ইডির সাম্প্রতিক অভিযানগুলির দিকে তাকালে দেখা যায়, কলকাতা জোনাল অফিস বিভিন্ন ধরনের আর্থিক অপরাধের মামলায় তদন্ত চালাচ্ছে। চলতি সেপ্টেম্বরেই ইডির সরকারি নথিতে কলকাতা, ইন্দোর ও জয়পুরে বিভিন্ন সংস্থা এবং ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত একাধিক ঠিকানায় তল্লাশির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর কলকাতা, ইন্দোর ও জয়পুরে একটি পৃথক মামলায় ২০টি আবাসিক ও অফিস প্রাঙ্গণে তল্লাশি চালানোর কথাও ইডির সার্চ রেকর্ডে রয়েছে।
তবে কোনও তদন্তকারী সংস্থার তল্লাশি মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থা অপরাধে দোষী প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। তল্লাশি সাধারণত তদন্তের অংশ হিসেবে নথি, ডিজিটাল তথ্য, আর্থিক লেনদেন এবং অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহের জন্য পরিচালিত হয়। পরবর্তী সময়ে তদন্তের ভিত্তিতে কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার বা চার্জশিট হলে তবেই অভিযোগের পরবর্তী আইনি পর্যায় শুরু হয়। এদিনের অভিযানের ক্ষেত্রেও এখনও তদন্ত চলছে এবং চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ্যে আসেনি।
এই অভিযানের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দেশের একাধিক শহরে একইসঙ্গে তল্লাশি চালানোর বিষয়টি। যদি একই আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংস্থার যোগাযোগের সন্দেহ থাকে, তাহলে তদন্তকারীরা বিভিন্ন জায়গায় সমন্বিতভাবে অভিযান চালিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন। কলকাতার দুই ব্যবসায়ীর সঙ্গে দেশের অন্য প্রান্তে থাকা ব্যক্তি বা সংস্থার কোনও আর্থিক যোগাযোগ রয়েছে কি না, তাও তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হতে পারে।
এখন নজর থাকবে, বালিগঞ্জ ও নিউ আলিপুরের অভিযানে তদন্তকারীরা কী তথ্য পান এবং পরবর্তী সময়ে ইডির পক্ষ থেকে কোনও সরকারি বিবৃতি দেওয়া হয় কি না। বিশেষ করে বিদেশি মুদ্রা বিনিময় সংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ব্যবসায়িক নথি এবং লেনদেনের ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য শহরে চলা সমান্তরাল তল্লাশি থেকে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে কলকাতার তদন্তের কোনও যোগসূত্র বেরিয়ে আসে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, পুজোর আগে বুধবার সাতসকালে কলকাতার বালিগঞ্জ ও নিউ আলিপুরে ইডির এই অভিযান ফের শহরে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তৎপরতা নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিদেশি মুদ্রা বিনিময়ের নামে আর্থিক অনিয়ম এবং বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগই আপাতত তদন্তের কেন্দ্রে। তবে অভিযোগগুলির সত্যতা এবং অর্থের প্রকৃত গতিপথ সম্পর্কে স্পষ্ট ছবি পেতে তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আগামী দিনে ইডির পরবর্তী পদক্ষেপ এবং সরকারি বিবৃতিই এই অভিযানের প্রকৃত পরিধি সম্পর্কে আরও তথ্য দিতে পারে।


