বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোকে ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে প্রস্তুতি। বিভিন্ন পুজো কমিটিতে খুঁটি পুজোর মাধ্যমে শুরু হয়েছে শারদোৎসবের তোড়জোড়। তবে এর মধ্যেই দুর্গাপুজোর সরকারি অনুদানকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন জল্পনা। নতুন সরকারের আমলে এবার আগের মতো সমস্ত পুজো কমিটিকে একই হারে সরকারি আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সূত্রের খবর, এবারে অনুদান দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘সবাইকে সমান’ নীতির পরিবর্তে প্রয়োজনভিত্তিক বণ্টনের পথে হাঁটতে পারে রাজ্য সরকার।
প্রাথমিকভাবে যে প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তাতে তুলনামূলক কম বাজেটের পুজো কমিটিগুলিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছে। এমনকি ১০ লক্ষ টাকার কম বাজেটের পুজোগুলিকে সরকারি আর্থিক সহায়তার আওতায় রাখার একটি প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে খবর। তবে এই ১০ লক্ষ টাকার সীমা এখনও চূড়ান্ত নয়। মুখ্যমন্ত্রী এবং অর্থ দফতরের আলোচনার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
### নতুন সরকারের আমলে প্রথম দুর্গাপুজো
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই প্রথম দুর্গাপুজো। ফলে এবারের পুজোয় সরকারি অনুদানের কাঠামোয় কোনও পরিবর্তন আনা হয় কি না, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে পুজো কমিটিগুলির মধ্যে।
গত কয়েক বছর ধরে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কলকাতা ও রাজ্যের বিভিন্ন পুজো কমিটিকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়েছে। সেই অনুদান ধীরে ধীরে বেড়েছে। ২০২০ সালে করোনা পরিস্থিতির সময় আর্থিক সমস্যায় থাকা পুজো কমিটিগুলিকে ৫০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে এই ব্যবস্থার বর্তমান কাঠামোর সূচনা হয়েছিল। পরবর্তী বছরগুলিতে অনুদানের পরিমাণ বাড়ানো হয়। ২০২৫ সালে প্রতিটি পুজো কমিটির জন্য অনুদানের পরিমাণ ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা ছিল।
এবার সেই সর্বজনীন ব্যবস্থাতেই পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
### ছোট বাজেটের পুজোকে কেন গুরুত্ব?
রাজ্য সরকারের ভাবনায় এবার ছোট বাজেটের পুজোগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। কারণ তুলনামূলক বড় বাজেটের পুজো কমিটিগুলির আর্থিক সক্ষমতা অনেক বেশি থাকে। অন্যদিকে ছোট পুজো কমিটিগুলির ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা পুজোর আয়োজনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
এই কারণেই প্রয়োজনের ভিত্তিতে অনুদান বণ্টনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।
প্রাথমিক আলোচনায় ১০ লক্ষ টাকার কম বাজেটের পুজো কমিটিগুলিকে সাহায্যের আওতায় রাখার প্রস্তাব রয়েছে। তবে কোনও পুজোর বাজেট কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, বাজেটের হিসাব কীভাবে যাচাই হবে এবং সীমারেখা অতিক্রম করলে কী হবে—এই সমস্ত বিষয় এখনও স্পষ্ট নয়।
### ১০ লক্ষ টাকার বেশি বাজেট হলে কি অনুদান বন্ধ?
এটাই এখন পুজো কমিটিগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। খবর অনুযায়ী, ১০ লক্ষ টাকার কম বাজেটের পুজোগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ১০ লক্ষ টাকার বেশি বাজেটের সমস্ত পুজো নিশ্চিতভাবেই অনুদান থেকে বাদ পড়বে।
১০ লক্ষ টাকার সীমা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী অর্থ দফতরের সঙ্গে আলোচনা করার পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা যাচ্ছে। ফলে এখনই কোনও পুজো কমিটির অনুদান বন্ধ হচ্ছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
এই বিষয়টি নিয়ে সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত পুজো কমিটিগুলির মধ্যে অনিশ্চয়তা থাকতেই পারে।
### বাজেট চূড়ান্ত করতে সমস্যায় কমিটিগুলি
অনুদানের বিষয়টি পরিষ্কার না হওয়ায় বেশ কয়েকটি পুজো কমিটি এখনও নিজেদের বাজেট চূড়ান্ত করতে পারেনি বলে জানা যাচ্ছে। পুজোর বাজেট নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্যের পরিমাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সরকারি অনুদান পাওয়া গেলে অনেক কমিটি সেই অর্থকে পুজোর বিভিন্ন খাতে ব্যবহার করতে পারে। ফলে অনুদান কত হবে, আদৌ পাওয়া যাবে কি না—তার উপর পুজোর আয়োজনের পরিধিও নির্ভর করতে পারে।
কোথাও থিম পরিবর্তনের কথা ভাবা হচ্ছে, আবার কোথাও শিল্পী পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে খবর। অর্থাৎ সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় বেশ কিছু পুজো কমিটির পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আসছে।
### পুজো কমিটিগুলির সঙ্গে বৈঠক
দুর্গাপুজোর অনুদান-সহ একাধিক বিষয় নিয়ে পুজো উদ্যোক্তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ‘ফোরাম ফর দুর্গোৎসব’-এর প্রতিনিধিরাও এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলেছেন।
বৈঠকে শুধু অনুদান নয়, পুজোর সময় বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ছাড়, রাস্তা ও গলির ব্যবস্থাপনা, হোর্ডিং-ব্যানারে কর ছাড়-সহ একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ফলে পুজো কমিটিগুলির দাবি শুধুমাত্র আর্থিক সাহায্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
পুজোর সময়ে বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, রাস্তা, যান চলাচল এবং বিজ্ঞাপনের মতো বিভিন্ন বিষয়ও কমিটিগুলির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
### ছোট পুজোর উদ্যোক্তাদের আশা
ছোট পুজো কমিটিগুলির অনেকেই মনে করছেন, প্রয়োজনভিত্তিক অনুদান ব্যবস্থা চালু হলে তাঁরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতে পারেন। কারণ বড় বাজেটের পুজোর সঙ্গে ছোট পুজোগুলির আর্থিক সক্ষমতার তুলনা করা কঠিন।
বেহালা সাহাপুর সাংগঠনী ক্লাবের সদস্য মৈনাক চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তাঁদের পুজোর বাজেট ১০ লক্ষ তো দূরের কথা, পাঁচ লক্ষ টাকাও নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলে পুজোর আয়োজন আরও ভালোভাবে করা সম্ভব হবে।
এই ধরনের ছোট পুজো কমিটিগুলির কাছেই এবার সরকারের সম্ভাব্য নতুন নীতির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।
### ২০২০ থেকে বদলাচ্ছে অনুদানের কাঠামো
করোনা মহামারির সময় পুজো কমিটিগুলির আর্থিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে ২০২০ সালে ৫০ হাজার টাকা করে সরকারি সহায়তা দেওয়া শুরু হয়। পরবর্তীকালে অনুদানের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
২০২৫ সালে প্রতিটি পুজো কমিটিকে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ কয়েক বছরের মধ্যে সরকারি অনুদানের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এবার সেই ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে তা নিঃসন্দেহে পুজো কমিটিগুলির জন্য বড় পরিবর্তন হবে।
### ‘সবাইকে সমান’ নীতি থেকে সরে আসার সম্ভাবনা
এতদিন নির্দিষ্ট কাঠামোয় পুজো কমিটিগুলিকে সরকারি আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এবার সেই সমান অনুদানের পদ্ধতির পরিবর্তে প্রয়োজনের ভিত্তিতে সাহায্য দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে খবর।
এর ফলে ছোট পুজো বেশি সাহায্য পেতে পারে, আবার বড় বাজেটের পুজো তুলনামূলক কম সাহায্য পেতে পারে অথবা কোনও কোনও ক্ষেত্রে অনুদানের আওতার বাইরে চলে যেতে পারে।
তবে চূড়ান্ত নীতি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোন পুজো কত টাকা পাবে, তা নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
### সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল রাজ্য সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। ১০ লক্ষ টাকার সীমা কার্যকর হবে কি না, অনুদানের পরিমাণ কত হবে এবং কোন ধরনের পুজো কমিটি কতটা সাহায্য পাবে—সবকিছুই এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
অর্থ দফতরের সঙ্গে আলোচনার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানা যাচ্ছে।
ফলে পুজো কমিটিগুলিকে এখনই কোনও নির্দিষ্ট অঙ্ক ধরে বাজেট তৈরি না করে সরকারি নির্দেশিকার জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে।
### দুর্গাপুজোর অর্থনীতিতেও প্রভাব
দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। মণ্ডপ নির্মাণ, প্রতিমা তৈরি, আলোকসজ্জা, শিল্পী, ঢাকি, নিরাপত্তা, বিজ্ঞাপন, বিদ্যুৎ, পরিবহণ এবং বিভিন্ন ছোট ব্যবসার সঙ্গে পুজো সরাসরি যুক্ত।
পুজোর বাজেটে পরিবর্তন এলে এই সমস্ত ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ছোট পুজোগুলির বাজেট কমলে স্থানীয় শিল্পী এবং পরিষেবা প্রদানকারীদের কাজের পরিমাণেও পরিবর্তন আসতে পারে।
অন্যদিকে ছোট পুজোগুলিকে সরকারি সাহায্যের আওতায় রাখলে তাদের আয়োজন কিছুটা শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
### শেষ পর্যন্ত কী হবে?
সব মিলিয়ে, দুর্গাপুজোর সরকারি অনুদান নিয়ে এবার বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগের মতো প্রতিটি পুজো কমিটিকে একই হারে আর্থিক সহায়তা না দিয়ে প্রয়োজনভিত্তিক বণ্টনের পথে হাঁটার কথা ভাবছে রাজ্য সরকার। প্রাথমিকভাবে ১০ লক্ষ টাকার কম বাজেটের পুজোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব সামনে এসেছে। তবে এই সীমা এখনও চূড়ান্ত নয়।
নতুন সরকারের আমলে প্রথম দুর্গাপুজোয় অনুদানের নিয়ম কী দাঁড়ায়, এখন সেদিকেই নজর পুজো উদ্যোক্তাদের। সরকারি সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে বহু পুজো কমিটির বাজেট এবং আয়োজনের পরিকল্পনা। অর্থ দফতরের সঙ্গে আলোচনার পর মুখ্যমন্ত্রীর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হলেই পরিষ্কার হবে—এবারের শারদোৎসবে কোন পুজো কতটা সরকারি সহায়তা পেতে চলেছে।


