কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় থিম পুজো সুরুচি সংঘে এবার উঠে আসছে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নিউ আলিপুরের এই পুজোর ২০২৬ সালের থিম **‘উৎস’**। আর সেই থিমের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ভারতীয় জন সংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। মণ্ডপে তাঁর বিশাল মূর্তি থাকবে। পাশাপাশি তাঁর জীবন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বঙ্গভঙ্গ ও দেশভাগের সময়কার ভূমিকার বিভিন্ন দিক শিল্পের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা হবে। ফলে এবারের সুরুচির পুজো শুধুমাত্র দেবী আরাধনার জায়গা নয়, ইতিহাসকে নতুন করে দেখারও একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠতে চলেছে।
সুরুচি সংঘের পুজো কলকাতার থিমভিত্তিক দুর্গাপুজোগুলির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষ পরিচিত। প্রতি বছরই নতুন ভাবনা, শিল্পকর্ম এবং মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে এই পুজো। ২০২৬ সালেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকছে। তবে এবারের বিষয়টি আগের অনেক বছরের তুলনায় আলাদা। কারণ এবার মণ্ডপের মূল ভাবনায় কোনও নির্দিষ্ট লোকসংস্কৃতি, সামাজিক সমস্যা কিংবা শিল্পরীতির পরিবর্তে জায়গা করে নিয়েছেন একজন ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও সময়কে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে গোটা ভাবনা।
এবারের থিমের নাম রাখা হয়েছে **‘উৎস’**। নামটির মধ্যেই রয়েছে একটি বিশেষ তাৎপর্য। একটি সময়, একটি রাজনৈতিক ভাবনা এবং একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের উৎস কোথায়—সেই প্রশ্নকে সামনে রেখেই মণ্ডপের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। দর্শনার্থীরা মণ্ডপে প্রবেশ করার পর ধাপে ধাপে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ইতিহাসের নানা অধ্যায়ের মুখোমুখি হবেন। মণ্ডপের শিল্পভাবনায় থাকবে তাঁর বিশালাকার মূর্তি। একই সঙ্গে এমন কিছু ইতিহাস তুলে ধরা হবে, যা সময়ের সঙ্গে সাধারণ মানুষের স্মৃতি থেকে অনেকটাই আড়ালে চলে গিয়েছে।
এই বছর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচি হয়েছে। সেই আবহকেই মাথায় রেখে সুরুচি সংঘ তাঁকে এবারের পুজোর থিমে বিশেষভাবে স্মরণ করছে। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে দেশভাগের সময় বাংলার ভবিষ্যৎ এবং হিন্দু-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলির ভারতের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই রাজনৈতিক সময় এবং তাঁর ভূমিকার নানা দিকই এবার শিল্পের ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভারতীয় রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। স্বাধীনতার আগে এবং পরে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ভারতীয় রাজনীতির গতিপথে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। তিনি ভারতীয় জন সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তী সময়ে ভারতীয় জনতা পার্টির রাজনৈতিক ধারার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, জাতীয়তাবাদী অবস্থান এবং দেশভাগের সময়কার ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বহু বছর ধরে আলোচনা চলে আসছে। সুরুচি সংঘের এবারের মণ্ডপে সেই ইতিহাসের বিভিন্ন দিককে শিল্পের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে আনা হবে।
বিশেষ করে ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগের প্রশ্নে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা এবারের থিমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশভাগের আগে বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল। একদিকে ছিল অবিভক্ত বাংলা রাখার নানা উদ্যোগ, অন্যদিকে ছিল বাংলাকে ভাগ করার দাবিও। এই পরিস্থিতিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বাংলার হিন্দু-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিকে ভারতের সঙ্গে রাখার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এবং সেই সময়কার কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে যে ঐতিহাসিক বিতর্ক ও ঘটনাপ্রবাহ তৈরি হয়েছিল, মণ্ডপে তারই কিছু অংশ ফুটিয়ে তোলা হবে।
মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৪৭ সালের ১৯ মার্চ ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেলকে লেখা একটি চিঠিতে বাংলার তৎকালীন গভর্নর ফ্রেডরিক বারোজ বাংলা ভাগের আন্দোলনে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং হিন্দু মহাসভার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছিলেন। সুরুচির থিমে সেই সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতিও তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, মণ্ডপের ভাবনা শুধুমাত্র কোনও ব্যক্তির জীবনী প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও সেখানে জায়গা পাবে।
শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক জীবনের আরও একটি দিকও এই থিমে গুরুত্ব পেতে পারে। তিনি একদিকে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আবার অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রয়োজনে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নেতাদের সঙ্গেও কাজ করেছিলেন। বাংলার তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ফজলুল হকের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সহযোগিতা এবং পরবর্তীতে কংগ্রেসের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার মতো ঘটনাও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে। ফলে তাঁকে শুধু একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর সময় এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে এই মণ্ডপে।
সুরুচির এবারের শিল্পভাবনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, ইতিহাস তুলে ধরলেও দেবী দুর্গার মূল পরিচয়কে বদলানো হচ্ছে না। থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মণ্ডপের পরিবেশ ও শিল্পকর্মে নানা ঐতিহাসিক উপাদান থাকবে, কিন্তু দেবী এখানে যথারীতি **মহিষাসুরমর্দিনী**। অর্থাৎ, থিম পুজোর আধুনিক শিল্পভাবনা এবং প্রচলিত দেবী আরাধনা—দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সুরুচি সংঘের এবারের শিল্পভাবনার দায়িত্বে রয়েছেন শিল্পী অনির্বাণ। তাঁর পরিকল্পনায় মণ্ডপে শ্যামাপ্রসাদের একটি বিশাল মূর্তি থাকবে। সেই সঙ্গে দর্শনার্থীরা তাঁর সম্পর্কে জানা-অজানা নানা তথ্য এবং ইতিহাসের কিছু বিস্মৃত অধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ মণ্ডপটি শুধুমাত্র চোখ ধাঁধানো সাজসজ্জার জন্য তৈরি হচ্ছে না; তার মধ্যে একটি তথ্যভিত্তিক এবং ঐতিহাসিক উপস্থাপনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
গত বছরও সুরুচি সংঘের মণ্ডপের ভাবনায় ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। অনুশীলন সমিতি এবং দুর্গাপুজোর ইতিহাসকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল আগের বছরের শিল্পভাবনা। এবার সেই ঐতিহাসিক ধারাই অন্য একটি অধ্যায়ে পৌঁছচ্ছে। তবে অনুশীলন সমিতির ইতিহাসের বদলে এবার কেন্দ্রবিন্দুতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। ফলে পরপর দুই বছরই সুরুচির পুজোয় বাংলার অতীত এবং রাজনৈতিক-সামাজিক ইতিহাসকে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এবারের পুজো নিয়ে কলকাতার দর্শনার্থীদের আগ্রহও যথেষ্ট। কলকাতার দুর্গাপুজোয় থিমের গুরুত্ব গত কয়েক দশকে ক্রমশ বেড়েছে। একসময় যেখানে সাবেকি প্রতিমা ও মণ্ডপই ছিল মূল আকর্ষণ, বর্তমানে বহু পুজো কমিটি শিল্প, ইতিহাস, পরিবেশ, লোকসংস্কৃতি কিংবা সমসাময়িক সামাজিক বিষয়কে কেন্দ্র করে মণ্ডপ তৈরি করে। সুরুচি সংঘ সেই থিম-পুজোর অন্যতম পরিচিত নাম। ফলে ‘উৎস’ থিমটি কীভাবে মণ্ডপে বাস্তবায়িত হয়, তা দেখতে দর্শনার্থীদের কৌতূহল তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
২০২৬ সালের দুর্গাপুজোও কলকাতায় বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করতে চলেছে। এ বছর মহাষষ্ঠী ১৬ অক্টোবর, সপ্তমী ১৭ ও ১৮ অক্টোবর, অষ্টমী ১৯ অক্টোবর, নবমী ২০ অক্টোবর এবং বিজয়া দশমী ২১ অক্টোবর। অর্থাৎ সপ্তমী দুদিন হওয়ায় এবারের পুজোয় দর্শনার্থীদের হাতে থাকবে বাড়তি একটি দিন।
সব মিলিয়ে, সুরুচি সংঘের ২০২৬ সালের দুর্গাপুজো এবার ইতিহাস ও আরাধনার এক অভিনব মেলবন্ধন তৈরি করতে চলেছে। ‘উৎস’ থিমে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বিশাল মূর্তি, তাঁর রাজনৈতিক জীবন, বঙ্গভাগের সময়কার ভূমিকা এবং বিস্মৃত ইতিহাসের নানা অধ্যায় দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হবে। তবে সেই ঐতিহাসিক উপস্থাপনার মধ্যেও দেবী দুর্গা থাকবেন তাঁর চিরাচরিত মহিষাসুরমর্দিনী রূপেই। ফলে ইতিহাস, শিল্প এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য—তিনের সমন্বয়ে নিউ আলিপুরের সুরুচি সংঘের মণ্ডপ এবার কলকাতার পুজো মানচিত্রে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করতে পারে।


