কলকাতার দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে বিভিন্ন পুজোর থিম, মণ্ডপসজ্জা এবং প্রচারের অভিনব ভাবনা। সেই আবহেই শিল্পী সনাতন দিন্দার সঙ্গে যুক্ত বেহালা ইয়ং মেন্স অ্যাসোসিয়েশনের দুর্গাপুজোকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। পুজোর একটি পোস্টার প্রকাশ্যে আসার পরই তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় আলোচনা। অভিযোগ ওঠে, ওই পোস্টারে প্রয়াত প্রবাদপ্রতীম তবলা বাদক ওস্তাদ জাকির হোসেনকে অসম্মান করা হয়েছে। যদিও পুজো উদ্যোক্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কোনও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে অপমান বা কটাক্ষ করার উদ্দেশ্য তাঁদের ছিল না। বিতর্কের পর তাঁরা দুঃখপ্রকাশও করেছেন।
এবার ৭৭তম বর্ষে পা দিয়েছে বেহালা ইয়ং মেন্স অ্যাসোসিয়েশনের দুর্গাপুজো। ২০২৬ সালের পুজোয় তাঁদের থিম ‘ছুটি’। মূল ভাবনায় অতীতের শৈশবের সঙ্গে বর্তমান AI-নির্ভর সময়ের শৈশবের পার্থক্যকে তুলে ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একসময় শিশুরা মেঘ দেখেও নানা কল্পনার জগৎ তৈরি করত, গল্পের চরিত্র বা নিজের মতো করে নানা দৃশ্য ভাবত। প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে সেই স্বতঃস্ফূর্ত কল্পনার জগত অনেকটাই বদলে যাচ্ছে—এই পরিবর্তনকেই মণ্ডপের ভাবনায় তুলে ধরতে চাইছেন উদ্যোক্তারা।
এই বিশেষ ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই মণ্ডপসজ্জা ও প্রতিমা নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শিল্পী সনাতন দিন্দাকে। কলকাতার পুজোয় তাঁর কাজ নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ বরাবরই থাকে। ফলে বেহালা ইয়ং মেন্স অ্যাসোসিয়েশনের এবারের পুজো নিয়েও আগে থেকেই কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মণ্ডপে এসে ছোটরা যেন নিজেদের শৈশবের কল্পনার জগতে ফিরে যেতে পারে, সেই আবহ তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। মা-কে ছুঁয়ে দেখার মতো অনুভূতি দেওয়ার কথাও ভাবনায় রয়েছে।
এরই মধ্যে পুজোর প্রচারের জন্য প্রকাশিত কয়েকটি পোস্টার সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে একটি পোস্টারকে ঘিরেই মূল বিতর্কের সূত্রপাত। পোস্টারে তবলার ছবি ব্যবহার করে লেখা হয়েছিল ‘ফাঁকির হোসেন’। নামের এই পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে অনেকের অভিযোগ, এর মাধ্যমে প্রয়াত তবলা শিল্পী ওস্তাদ জাকির হোসেনকে ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং তাঁকে অসম্মান করা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে বেশ কিছু মানুষ প্রশ্ন তোলেন, একজন কিংবদন্তি শিল্পীর নামকে এভাবে ব্যবহার করা কতটা গ্রহণযোগ্য। কেউ কেউ পুজো উদ্যোক্তাদের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবিও জানান।
তবে পোস্টারটি নিয়ে যে ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে একমত নয় বেহালা ইয়ং মেন্স অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃপক্ষ। বিতর্কের পর ক্লাবের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়। সেখানে জানানো হয়, তাঁদের এবারের বিষয়ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই শিশুসুলভ উপস্থাপনার মাধ্যমে দর্শকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কোনও প্রবাদপ্রতীম ব্যক্তিত্বকে ছোট করা, কটাক্ষ করা বা অপমান করা তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল না বলেই দাবি উদ্যোক্তাদের। একই সঙ্গে তাঁদের পোস্টার কারও মনে আঘাত দিয়ে থাকলে তাঁরা তার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন এবং ক্ষমা চান।
বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পোস্টারটির সঙ্গে শিল্পী সনাতন দিন্দার সম্পর্ক। ক্লাব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিতর্কিত পোস্টার তৈরির সঙ্গে সনাতন দিন্দার কোনও যোগ নেই। তাঁর দায়িত্ব মূলত পুজোর থিম, প্রতিমা এবং মণ্ডপসজ্জার কাজ নিয়ে। পোস্টার তৈরির পরিকল্পনা বা নির্মাণের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন না বলেই উদ্যোক্তাদের বক্তব্য। ফলে পোস্টার নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিকে শিল্পীর মূল শিল্পকর্মের সঙ্গে এক করে দেখার কোনও কারণ নেই বলেও কার্যত স্পষ্ট করা হয়েছে।
শিল্পী সনাতন দিন্দার বক্তব্যও একই। সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, এবারের পুজোর থিম এবং প্রতিমার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। সেই অনুযায়ী তিনি নিজের ভাবনাচিন্তা থেকে প্রতিমা ও মণ্ডপসজ্জার কাজ করছেন। কিন্তু বিতর্কিত পোস্টার তৈরির সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ পুজোর শিল্পভাবনা এবং প্রচারের জন্য তৈরি পোস্টার—দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখার পক্ষেই তাঁর বক্তব্য।
বেহালা ইয়ং মেন্স অ্যাসোসিয়েশনের এবারের থিমের মূল বিষয় অবশ্য বিতর্কিত পোস্টার নয়, বরং হারিয়ে যেতে বসা শৈশবের কল্পনাশক্তি। বর্তমান সময়ে শিশুদের জীবনে প্রযুক্তি এবং AI-এর প্রভাব কীভাবে তাদের চিন্তাভাবনা ও বিনোদনের ধরন বদলে দিচ্ছে, সেই বিষয়কে কেন্দ্র করেই মণ্ডপের পরিকল্পনা। উদ্যোক্তাদের ভাবনায়, অতীতের মতো আকাশের মেঘ দেখে গল্প বানানো কিংবা সামান্য কোনও দৃশ্য থেকে নিজের মতো করে কল্পনার জগৎ তৈরি করার অভ্যাস এখন অনেকটাই কমেছে। সেই পুরনো শৈশবের অনুভূতিকে দর্শকদের সামনে ফিরিয়ে আনাই তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য।
কলকাতার দুর্গাপুজোয় পুজোর মূল আয়োজনের পাশাপাশি প্রচার এবং পোস্টারও এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। বিভিন্ন পুজো কমিটি নিজেদের থিম ও ভাবনা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে নানা ধরনের সৃজনশীল পোস্টার, ভিডিও এবং সামাজিক মাধ্যমের প্রচার ব্যবহার করে। সেই জায়গা থেকেই বেহালা ইয়ং মেন্স অ্যাসোসিয়েশনের পোস্টারটিও মানুষের নজরে আসে। কিন্তু সৃজনশীল উপস্থাপনা নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক দেখিয়ে দিল, কোনও শিল্পী বা বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে ঘিরে ব্যবহৃত শব্দ ও ছবির ব্যাখ্যা দর্শকের কাছে কীভাবে ভিন্ন অর্থ তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ক্লাব কর্তৃপক্ষের ক্ষমাপ্রার্থনা এবং শিল্পী সনাতন দিন্দার পোস্টার থেকে নিজেকে আলাদা করার বক্তব্যই আপাতত বিতর্কের মূল কেন্দ্র। উদ্যোক্তারা যেমন জানিয়েছেন তাঁদের উদ্দেশ্য কাউকে অপমান করা ছিল না, তেমনই সনাতন দিন্দাও স্পষ্ট করেছেন যে পোস্টার তৈরির সঙ্গে তিনি যুক্ত নন। ফলে বিতর্কের মধ্যেও এবারের বেহালা ইয়ং মেন্স অ্যাসোসিয়েশনের মূল আকর্ষণ ‘ছুটি’ থিম এবং সনাতন দিন্দার প্রতিমা ও মণ্ডপসজ্জা নিয়েই দর্শকদের আগ্রহ থাকছে।


