মধ্যপ্রাচ্যে চলতে থাকা সংঘাতের মধ্যে ফের বিপদের মুখে পড়ল বাণিজ্যিক জাহাজ। ওমানের পূর্ব উপকূলের কাছে ভারতের দিকে আসার পথে **MV Cape Dao** নামে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলায় এক ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ওমানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, জাহাজে থাকা ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ওমানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। পরে ভারতের বিদেশমন্ত্রকও জানায়, জাহাজে থাকা ২০ জন ভারতীয় নাবিকের মধ্যে ১৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে।
আক্রান্ত জাহাজটির নাম **MV Cape Dao**। এটি Antigua and Barbuda-এর পতাকাবাহী একটি বাল্ক ক্যারিয়ার। বিভিন্ন সামুদ্রিক সূত্র ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাহাজটি ওমানের জলসীমার কাছে দিয়ে ভারতের দিকে যাচ্ছিল। সেই সময় জাহাজটিতে আঘাত হানে একাধিক প্রজেক্টাইল। Forward Seamen’s Union of India বা FSUI-এর দাবি অনুযায়ী, জাহাজের বাম দিকে দু’টি টর্পেডোর আঘাত লাগে। একটি আঘাত করে C-deck-এর আবাসিক অংশে এবং অন্যটি ইঞ্জিন রুমের কাছাকাছি জাহাজের হালে। তবে হামলাটি কারা চালিয়েছে, তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
### মৃত নাবিকের পরিচয়
হামলায় নিহত ভারতীয় নাবিকের নাম **সূরজ যাদব** বলে জানিয়েছে Forward Seamen’s Union of India। সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি উত্তরপ্রদেশের দেওরিয়া জেলার বাসিন্দা ছিলেন এবং জাহাজে ‘Wiper’ হিসেবে কাজ করতেন। হামলার সময় মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। পরে সেই আঘাতেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে সামুদ্রিক সূত্রের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতীয় বিদেশমন্ত্রক মৃত নাবিকের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ চলাচল ও জলপথ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, সূরজ যাদবের দেহ যথাযোগ্য মর্যাদায় দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে এবং তাঁর পরিবারের পাশে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
### ১৯ না ২০ ভারতীয় নাবিক?
এই ঘটনায় জাহাজে থাকা ভারতীয় নাবিকের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে সামান্য পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ভারতীয় বিদেশমন্ত্রক জানিয়েছে, **মোট ২০ জন ভারতীয় নাবিক** জাহাজটিতে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে। ওমানে ভারতীয় দূতাবাসের প্রাথমিক বিবৃতিতে অবশ্য ১৯ জন ভারতীয় নাবিকের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। পরে সরকারি বিবৃতিতে ২০ জন ভারতীয় নাবিকের সংখ্যা স্পষ্ট করা হয়।
অন্যদিকে, Forward Seamen’s Union of India জানিয়েছে, আক্রান্ত জাহাজটিতে মোট ২৮ জন ক্রু ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে ২০ জন ভারতীয়। হামলার পর ওমানের Royal Navy-র সহায়তায় জাহাজের ক্রুদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। ওমানের সরকারি সংবাদমাধ্যমও জানিয়েছে, জাহাজটির ২৭ জন ক্রুকে উদ্ধার করা হয়েছে। অর্থাৎ উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন হলেও হামলার সঠিক পরিস্থিতি এবং ক্রুদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রাথমিক প্রতিবেদনে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
### ওমানের Royal Navy-র উদ্ধার অভিযান
হামলার পর জাহাজটির ক্রুদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার জন্য উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। ওমানের Royal Navy সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে জাহাজের ক্রুদের উদ্ধার করে। জীবিত ভারতীয় নাবিকদের দ্রুত দেশে ফেরানোর জন্য ভারতীয় দূতাবাসও ওমান প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। MEA জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া ভারতীয় নাবিকদের দ্রুত দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া নিয়ে ওমানের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।
সামুদ্রিক সূত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকজন নাবিক সামান্য আহত হয়েছেন। তবে উদ্ধার হওয়া অধিকাংশ ক্রু বর্তমানে নিরাপদে রয়েছেন। হামলার পর সংশ্লিষ্ট RPSL সংস্থা এবং জাহাজের মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ঘটনার বিষয়ে আরও বিস্তারিত রিপোর্ট ও তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য সামনে আসার অপেক্ষা রয়েছে।
### হরমুজ ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
এই হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন হরমুজ প্রণালী ও উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস পরিবহণের একটি বড় অংশ এই জলপথের উপর নির্ভরশীল। ফলে ওই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হামলা হলে শুধু নাবিকদের নিরাপত্তাই নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক পরিবহণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়।
গত কয়েক মাসে ওই অঞ্চলে ভারতীয় নাবিকদের নিয়ে একাধিক নিরাপত্তাজনিত ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কিছু ঘটনায় ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়েছে, আবার কোথাও নাবিকদের উদ্ধার করে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে নতুন করে MV Cape Dao-তে হামলা ভারতীয় সামুদ্রিক কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আরও বাড়িয়েছে।
### হামলার নিন্দা ভারতের
MV Cape Dao-তে হামলার তীব্র নিন্দা করেছে ভারত। বিদেশমন্ত্রক জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজ, নাবিক এবং বেসামরিক পরিকাঠামোর উপর এ ধরনের হামলা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক জলপথে অবাধ ও নিরাপদ নৌ-চলাচল এবং বাণিজ্য নিশ্চিত করার উপরও জোর দিয়েছে নয়াদিল্লি। পাশাপাশি উত্তেজনা কমাতে আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে পরিস্থিতির সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে ভারত।
তবে এই হামলার পিছনে কোন পক্ষ রয়েছে, সে বিষয়ে এখনও কোনও সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। ফলে হামলার জন্য নির্দিষ্ট কোনও দেশ বা সংগঠনকে দায়ী করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য আপাতত প্রকাশ্যে নেই। ভারতীয় দূতাবাস ও ওমানের কর্তৃপক্ষ ঘটনার পরবর্তী তদন্ত ও উদ্ধার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
এদিকে Forward Seamen’s Union of India এই ঘটনার পর ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে নিরাপদ নৌপথ, জাহাজের সুরক্ষা এবং ভবিষ্যতে এমন হামলা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। সামুদ্রিক অঞ্চলে একের পর এক হামলার মধ্যে ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন অন্যতম বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।


