বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন, ট্যাব এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার যত বেড়েছে, ততই শিশু-কিশোরদের বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ার অভিযোগ উঠছে। এই পরিস্থিতিতে পড়ুয়াদের আবার বইয়ের জগতে ফিরিয়ে আনতে বড় উদ্যোগ নিল পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশন (Samagra Shiksha Mission)।
সম্প্রতি জারি হওয়া একটি নির্দেশিকায় রাজ্যের সমস্ত সরকারি এবং সরকার-পোষিত বিদ্যালয়ে লাইব্রেরি ও রিডিং কর্নার (Reading Corner) গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হল ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং তাদের ভাষাগত ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করা।
নির্দেশিকায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে, যেসব সরকারি বা সরকার-পোষিত বিদ্যালয়ে এখনও লাইব্রেরি নেই, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে লাইব্রেরি তৈরি করতে হবে। অন্যদিকে, যেসব স্কুলে পর্যাপ্ত পরিকাঠামো রয়েছে, সেখানে শ্রেণিকক্ষ অথবা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আলাদা করে রিডিং কর্নার তৈরি করতে হবে, যাতে পড়ুয়ারা অবসর সময়ে বসে বই পড়তে পারে। এই রিডিং কর্নারকে শিশু-বান্ধব পরিবেশে সাজানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
সমগ্র শিক্ষা মিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, লাইব্রেরি বা রিডিং কর্নারে শুধুমাত্র পাঠ্যবই নয়, বিভিন্ন ধরনের জ্ঞানবর্ধক বইও রাখতে হবে। এর মধ্যে থাকবে শিশু সাহিত্য, গল্পের বই, রূপকথা, দ্বিভাষিক বই, বিজ্ঞান ও গণিত বিষয়ক বই, মানচিত্র, বিশ্বকোষ, পরিবেশ সম্পর্কিত বই, সংস্কৃতি বিষয়ক বই, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনী এবং বয়সভিত্তিক সহায়ক শিক্ষামূলক বই। উদ্দেশ্য হল ছাত্রছাত্রীরা যাতে আনন্দের সঙ্গে পড়াশোনা করতে পারে এবং পাঠ্যবইয়ের বাইরেও জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ (NEP 2020)-এ শিশুদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই নীতির সঙ্গেই সামঞ্জস্য রেখে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত বই পড়লে শিশুদের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়, ভাষা দক্ষতা বাড়ে, কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে এবং বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাও উন্নত হয়। পাশাপাশি মনোযোগ বৃদ্ধি এবং মানসিক বিকাশেও বই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আলাদা কোনও অতিরিক্ত সরকারি বরাদ্দের কথা নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়নি। পরিবর্তে বিদ্যালয়গুলিকে নিজেদের প্রাপ্ত গ্রান্ট ব্যবহার করার পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষিকা, প্রাক্তন পড়ুয়া, অভিভাবক এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বই সংগ্রহের জন্য ‘বুক ডোনেশন ড্রাইভ’ আয়োজন এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বা কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR)-এর সহায়তা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
শুধু লাইব্রেরি তৈরি করাই নয়, সেই লাইব্রেরির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। শিক্ষকদের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে যাতে তাঁরা নির্দিষ্ট সময়ে পড়ুয়াদের লাইব্রেরিতে নিয়ে যান এবং বই পড়ার জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করেন। এতে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ধীরে ধীরে নিয়মিত পাঠাভ্যাস গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন প্রয়োজন, তেমনই বই পড়ার অভ্যাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বই শুধু পরীক্ষার ফল ভালো করতে সাহায্য করে না, বরং শিশুদের চিন্তাশক্তি, মূল্যবোধ, ভাষা ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বিদ্যালয় পর্যায়ে লাইব্রেরি সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করার এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।
বর্তমানে রাজ্যের বহু বিদ্যালয়ে লাইব্রেরি থাকলেও সেগুলির নিয়মিত ব্যবহার হয় না বা পর্যাপ্ত বইয়ের অভাব রয়েছে। নতুন নির্দেশিকা কার্যকর হলে শুধু নতুন লাইব্রেরিই তৈরি হবে না, বিদ্যমান লাইব্রেরিগুলিকেও আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে ছোট আকারের রিডিং কর্নার থাকলে পড়ুয়ারা অবসরে বই পড়তে আরও উৎসাহিত হবে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়েও বইয়ের প্রতি ভালোবাসা ফিরিয়ে আনতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, সমগ্র শিক্ষা মিশনের এই নির্দেশ কত দ্রুত রাজ্যের সরকারি ও সরকার-পোষিত বিদ্যালয়গুলিতে বাস্তবায়িত হয় এবং পড়ুয়াদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে কতটা সফল হয়।


