তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় প্রতীক ‘ঘাসের উপর জোড়াফুল’ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুই শিবিরের মধ্যে টানাপড়েন ক্রমেই জটিল আকার নিয়েছে। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—শেষ পর্যন্ত কোন শিবির ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে? আর যদি নির্বাচন কমিশন কোনও পক্ষকেই ওই প্রতীক ব্যবহারের অনুমতি না দেয়, তাহলে দুই শিবির কোন নতুন প্রতীক নিয়ে ভোটের ময়দানে নামবে?
প্রথমে বিষয়টি ছিল মূলত দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। পরবর্তীতে সেই বিরোধ সরাসরি পৌঁছে যায় নির্বাচন কমিশনের দরজায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী—দুই পক্ষই নিজেদের তৃণমূল কংগ্রেসের বৈধ সংগঠন হিসেবে দাবি করেছে। একইসঙ্গে দুই পক্ষই দলীয় নাম এবং ঐতিহ্যবাহী নির্বাচনী প্রতীকের উপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। নির্বাচন কমিশনের সামনে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানের সমর্থনে নথি ও যুক্তি পেশ করেছে।
উপনির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার পর বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগর—এই দুই কেন্দ্রে ৬ অক্টোবর উপনির্বাচন হওয়ার কথা। মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল ১৬ সেপ্টেম্বর। তার আগেই দুই শিবির নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করে এবং মনোনয়নও জমা দেয়। ফলে একই দলের পরিচয় ব্যবহার করে দুই পক্ষের প্রার্থী দাঁড়ানোয় নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মমতা শিবিরের পক্ষ থেকে নন্দীগ্রামে সঞ্চিতা প্রধান দে এবং রেজিনগরে রবিউল আলম চৌধুরীকে প্রার্থী করা হয়। অন্যদিকে ঋতব্রত শিবিরও পালটা প্রার্থী দেয়। রেজিনগরে তাদের প্রার্থী শেখ সফিউজ্জামান এবং নন্দীগ্রামে মহম্মদ এহতেশামুল হক মনোনয়ন জমা দেন। দুই পক্ষের মনোনয়ন জমা পড়লেও তখনও পরিষ্কার ছিল না, কোন প্রতীকে প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত ভোটে লড়বেন।
এর আগে দুই শিবিরই নির্বাচন কমিশনের সামনে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরে। কমিশন দলীয় নাম ও প্রতীক নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নথি, সাংগঠনিক সমর্থন এবং অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। রাজনৈতিক দলের প্রতীক নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে Election Symbols (Reservation and Allotment) Order, 1968-এর ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে শিবসেনা ও এনসিপির মতো দলীয় বিভাজনের ক্ষেত্রেও কমিশন অন্তর্বর্তীভাবে মূল নাম ও প্রতীক ‘ফ্রিজ’ করে দুই গোষ্ঠীকে আলাদা নাম ও প্রতীক ব্যবহারের ব্যবস্থা করেছিল।
তৃণমূলের ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। বিশেষ করে উপনির্বাচনের জন্য সময় খুব কম থাকায় চূড়ান্তভাবে দলের মালিকানা নির্ধারণের আগে কমিশন অন্তর্বর্তী কোনও ব্যবস্থা নিতে পারে বলে জল্পনা তৈরি হয়। দুই শিবিরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শুনানির পর সেই সম্ভাবনাই আরও জোরালো হয়।
ঋতব্রত শিবিরের বক্তব্য, দলের সাংগঠনিক কাঠামো এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমর্থনসহ বিভিন্ন নথির ভিত্তিতে তাদের দাবি বিবেচনা করা উচিত। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনে নিজের বক্তব্য তুলে ধরে জানান, দলের ভবিষ্যৎ পরিচালনা যেন কেবল একজন ব্যক্তির সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর না করে, সেটিও তাঁদের দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যদিকে মমতা শিবিরের বক্তব্য, তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা এবং দলীয় প্রতীকের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে উপেক্ষা করা যায় না। দুই পক্ষের বক্তব্যই কমিশনের সামনে নথিভুক্ত হয়েছে।
প্রতীক নিয়ে জটিলতার কারণে এবার উপনির্বাচনের প্রচারেও নতুন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এতদিন ‘জোড়াফুল’ ছিল তৃণমূলের সঙ্গে ভোটারদের পরিচিতির অন্যতম প্রধান চিহ্ন। সেই প্রতীক ছাড়া দুই শিবিরকে নতুন পরিচয় নিয়ে প্রচারে নামতে হলে প্রার্থী ও দলের প্রচার কৌশলেও পরিবর্তন আনতে হতে পারে। বিশেষ করে একই রাজনৈতিক ধারার দুই পক্ষ একই নির্বাচনী এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে প্রতীকের বিষয়টি ভোটারদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য ১৭ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন অন্তর্বর্তী নির্দেশে দুই পক্ষকেই ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং সংরক্ষিত ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ব্যবহারে আপাতত নিষেধাজ্ঞা দেয়। অর্থাৎ নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে মমতা শিবির কিংবা ঋতব্রত শিবির—কেউই আপাতত পুরনো জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না। দুই পক্ষকে কমিশনের মুক্ত প্রতীকের তালিকা থেকে পৃথক প্রতীক বেছে নিতে হবে। পাশাপাশি, নিজেদের জন্য পৃথক নামও প্রস্তাব করতে হবে |
কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, দুই শিবিরকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তিনটি করে বিকল্প নাম এবং তিনটি করে প্রতীকের প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে। ফলে যে প্রশ্ন নিয়ে এতদিন রাজনৈতিক মহলে জল্পনা চলছিল—‘জোড়াফুল’ কার হাতে থাকবে—তার অন্তর্বর্তী সমাধান হয়েছে অন্যভাবে। আপাতত কোনও পক্ষকেই প্রতীকটি দেওয়া হয়নি। দলের নাম ও প্রতীকের চূড়ান্ত অধিকার নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বৃহত্তর সিদ্ধান্ত এখনও বাকি।
ফলে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনের লড়াই এবার শুধু প্রার্থী বনাম প্রার্থীর লড়াই নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে দলীয় পরিচয়, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচনী প্রতীকের প্রশ্নও। আপাতত দুই শিবিরকেই নতুন নাম ও প্রতীক নিয়ে ভোটের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। আগামী দিনে কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ও ঐতিহ্যবাহী ‘জোড়াফুল’ প্রতীকের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের অধিকার কোন পক্ষ পাবে।


