টাটা গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতৃত্বে বড়সড় পরিবর্তনের জল্পনার মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিল টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদ। এন চন্দ্রশেখরনকে আরও পাঁচ বছরের জন্য টাটা সন্সের এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান পদে পুনর্নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত বোর্ড বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর ফলে বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও টাটা গোষ্ঠীর হোল্ডিং সংস্থার নেতৃত্বে থাকার পথ খুলে গেল এন চন্দ্রশেখরনের সামনে। তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে টাটা ট্রাস্টসের আপত্তি প্রকাশ্যে আসায় সংস্থার অভ্যন্তরীণ পরিচালন কাঠামো নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ১২ আগস্ট এন চন্দ্রশেখরন জানিয়েছিলেন, তাঁর বর্তমান মেয়াদ শেষ হলে তিনি আর টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদে পুনর্নিয়োগের জন্য নিজের নাম প্রস্তাব করবেন না। তাঁর বর্তমান মেয়াদ ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা ছিল। সেই ঘোষণার পর টাটা গোষ্ঠীতে উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে টাটা সন্সের পরিচালন পর্ষদ তাঁকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানায়। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে সেই অনুরোধে সাড়া দিয়ে চন্দ্রশেখরন আরও পাঁচ বছর দায়িত্বে থাকার বিষয়ে সম্মতি দেন। এরপর বোর্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে তাঁর পুনর্নিয়োগ অনুমোদিত হয়।
টাটা সন্সের তরফে জানানো হয়েছে, পরিচালন পর্ষদের সদস্যরা এন চন্দ্রশেখরনের নেতৃত্বে সংস্থার কাজের প্রশংসা করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে টাটা গোষ্ঠীর বিভিন্ন ব্যবসা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বিমান পরিষেবা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ এগিয়েছে বলে সংস্থার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করেই তাঁকে আরও এক মেয়াদের জন্য দায়িত্বে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
তবে বোর্ডের সিদ্ধান্তের পরেই টাটা ট্রাস্টসের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। টাটা সন্সে প্রায় ৬৬ শতাংশ অংশীদারি রয়েছে টাটা ট্রাস্টসের। ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা এই পুনর্নিয়োগের বিরোধিতা করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাস্টসের বক্তব্য, টাটা সন্সের Articles of Association বা সংস্থার পরিচালন সংক্রান্ত নিয়ম অনুযায়ী চেয়ারম্যানের পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাস্টসের মনোনীত পরিচালকদের সম্মতি প্রয়োজন। সেই সম্মতি না থাকা সত্ত্বেও পুনর্নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নোয়েল টাটার ভোট এই প্রস্তাবের বিপক্ষে গিয়েছে বলেও জানা গিয়েছে।
টাটা ট্রাস্টসের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তকে আইনগতভাবে বৈধ নয় বলে দাবি করা হয়েছে। এমনকি প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের আইনি মতামতের কথাও ট্রাস্টসের তরফে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে এখনও কোনও নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে বোর্ডের সিদ্ধান্তের পর টাটা সন্স এবং টাটা ট্রাস্টসের মধ্যে মতপার্থক্য আরও প্রকট হয়েছে। সংস্থার মালিকানা, পরিচালন ক্ষমতা এবং চেয়ারম্যান নিয়োগের অধিকার—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই মূল বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি টাটা সন্সকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। পরিচালন পর্ষদ টাটা সন্সের সম্ভাব্য তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে রিপোর্টে প্রকাশ। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নিয়ম অনুযায়ী, টাটা সন্সের মতো নির্দিষ্ট শ্রেণির নন-ব্যাঙ্কিং ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানির জন্য তালিকাভুক্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অতীতে সংস্থাটি তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা এড়াতে কিছু আর্থিক পদক্ষেপ করলেও সেই প্রক্রিয়া নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবস্থান স্পষ্ট ছিল না। এখন তালিকাভুক্তির সম্ভাবনা সামনে আসায় টাটা সন্সের ভবিষ্যৎ কর্পোরেট কাঠামো নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
টাটা গোষ্ঠীর জন্য এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য যথেষ্ট বেশি। একদিকে চেয়ারম্যান পদে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় থাকছে, অন্যদিকে টাটা ট্রাস্টসের আপত্তি সংস্থার প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। টাটা সন্সের অধীনে টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস, টাটা মোটরস, টাটা স্টিল, টাটা ডিজিটাল এবং এয়ার ইন্ডিয়ার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা রয়েছে। ফলে শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের প্রভাব গোষ্ঠীর বিভিন্ন সংস্থা, বিনিয়োগকারী এবং কর্মীদের উপর পড়তে পারে।
এখন নজর থাকবে টাটা সন্সের পরবর্তী সাধারণ সভার দিকে। সেখানে চেয়ারম্যানের পুনর্নিয়োগ এবং সম্ভাব্য তালিকাভুক্তির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হয়, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বোর্ডের সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে কি না, টাটা ট্রাস্টসের আপত্তি কীভাবে মেটানো হবে এবং ভবিষ্যতে টাটা গোষ্ঠীর নেতৃত্বের কাঠামো কোন পথে এগোবে—এই প্রশ্নগুলির উত্তরই এখন শিল্পমহলের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে।


