রাজ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে দায়িত্বও সমানভাবে বহন করতে হবে। সেই বার্তাই এবার স্পষ্ট ভাষায় দিলেন পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি সামিক ভট্টাচার্য। দলীয় কর্মী, জনপ্রতিনিধি এবং নতুনভাবে দলে যোগ দেওয়া নেতাদের উদ্দেশে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, কোনও অবস্থাতেই তোলাবাজি, দুর্নীতি, দাদাগিরি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার বরদাস্ত করা হবে না। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি এক সাংগঠনিক বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সামিক ভট্টাচার্য বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। তাই বিজেপির কর্মীদের এমন কোনও আচরণ করা উচিত নয়, যাতে সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। তিনি স্পষ্ট করে দেন, দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এমন কোনও কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজ্য বিজেপি সভাপতির বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে ‘তোলাবাজি’ প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে এই সংস্কৃতি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু নতুন প্রশাসনের আমলে সেই প্রবণতা কোনওভাবেই চলতে দেওয়া হবে না। তাঁর কথায়, শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই হবে না, রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
সামিক ভট্টাচার্য আরও বলেন, কোনও দলীয় কর্মী বা জনপ্রতিনিধি যদি নিজের পরিচয় ব্যবহার করে ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ বা সরকারি প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেন, তবে দল তার পাশে দাঁড়াবে না। বরং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাঁর মতে, মানুষের বিশ্বাস অর্জনই এখন দলের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
তিনি কর্মীদের অহংকার থেকেও দূরে থাকার পরামর্শ দেন। বক্তব্যে তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় বলেন, জনসমর্থনকে কখনও স্থায়ী বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার বা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তার জবাব জনগণই দেবে। সেই কারণেই তিনি সকলকে সংযম, শৃঙ্খলা এবং ভদ্র আচরণ বজায় রাখার আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তোলাবাজির অভিযোগ সামনে আসার পরিপ্রেক্ষিতেই দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের এই বার্তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে দলীয় স্তরেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। ফলে সংগঠনের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রশ্নে বিজেপি নেতৃত্ব যে কঠোর অবস্থান নিতে চাইছে, তা এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সরকারে আসার পর যেকোনও রাজনৈতিক দলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং কর্মীদের আচরণের উপর নজর রাখা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই সামিক ভট্টাচার্যের এই সতর্কবার্তা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল দলের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখা এবং সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
তবে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এই মন্তব্যকে ঘিরে কটাক্ষও করেছে। তাদের দাবি, রাজ্য বিজেপি সভাপতির বক্তব্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে সংগঠনের মধ্যেই এমন অভিযোগ রয়েছে। যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কোনও অনিয়মের বিরুদ্ধে দলের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’ এবং অভিযোগ সামনে এলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, আগামী দিনে দলের কর্মীদের আচরণ, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং জনসংযোগের ক্ষেত্রে এই বার্তা কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে সামিক ভট্টাচার্যের স্পষ্ট বার্তা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে ‘পরিষ্কার ভাবমূর্তি’ এবং ‘জবাবদিহিতা’-র প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে।


