পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফের প্রকাশ্যে এল তৃণমূল কংগ্রেস ও কংগ্রেসের দূরত্ব। নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের আসন্ন উপনির্বাচনকে ঘিরে দুই দলের মধ্যে আসন সমঝোতার যে আলোচনা চলছিল, তা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেল। তৃণমূলের তরফে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি না রাখার অভিযোগ তোলা হয়েছে। অন্যদিকে, কংগ্রেস তৃণমূলের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের মতো করে নির্বাচনে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে খবর।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ঘটনা শুধু দুটি আসনের উপনির্বাচনের সমীকরণকেই প্রভাবিত করবে না, বরং বাংলায় বিরোধী রাজনীতির বৃহত্তর ঐক্য নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলবে। একসময় বিজেপির বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়াইয়ের কথা বললেও, ভোটের ময়দানে তৃণমূল ও কংগ্রেসের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
## কী প্রস্তাব দিয়েছিল তৃণমূল?
সূত্রের খবর, নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর—এই দুই আসনে পারস্পরিক সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূলের প্রস্তাব ছিল, নন্দীগ্রাম আসনে তারা নিজেদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে কংগ্রেসকে সমর্থন করতে পারে। বিনিময়ে রেজিনগর কেন্দ্রে কংগ্রেসকে প্রার্থী না দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল।
অর্থাৎ, একটি আসনে তৃণমূল এবং অন্য আসনে কংগ্রেস—এই ‘কুইড প্রো কো’ বা পারস্পরিক ছাড়ের ভিত্তিতে সমঝোতার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তৃণমূলের যুক্তি ছিল, বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট ভাগাভাগি রুখতে বিরোধী দলগুলির মধ্যে বোঝাপড়া জরুরি। কিন্তু কংগ্রেস সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি।
কংগ্রেসের তরফে জানানো হয়েছে, তারা কোনও পারস্পরিক আসন প্রত্যাহার চুক্তিতে যেতে আগ্রহী নয়। ফলে দুই দলের মধ্যে আলোচনা আর এগোয়নি। এর জেরেই নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে পৃথকভাবে লড়াইয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
## কংগ্রেসের অবস্থান কী?
কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট, তারা এই উপনির্বাচনে নিজেদের রাজনৈতিক জমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে চাইছে। বিশেষ করে রেজিনগর আসনটি কংগ্রেসের পুরনো সংগঠন ও ভোটব্যাঙ্কের সঙ্গে যুক্ত। সেই কেন্দ্রে তৃণমূলের সঙ্গে সমঝোতা করলে দলের স্থানীয় কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কাও কংগ্রেসের মধ্যে রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।
কংগ্রেসের বক্তব্য, প্রতিটি নির্বাচনে দলকে নিজের সংগঠন এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মানুষের কাছে যেতে হবে। শুধুমাত্র তৃণমূলের সঙ্গে সমঝোতা করে লড়াই করলে কংগ্রেসের স্বাধীন রাজনৈতিক পরিচয় দুর্বল হতে পারে। তাই তারা নিজেদের প্রার্থী দিয়ে ভোটে নামার পথেই হাঁটছে।
তবে কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্ত তৃণমূলের কাছে অপ্রত্যাশিত নয়। রাজ্যে তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেসের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। লোকসভা নির্বাচন, বিধানসভা নির্বাচন এবং বিভিন্ন উপনির্বাচনে দুই দলের মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে একাধিকবার মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এবার নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর সেই সংঘাতকে আরও প্রকাশ্যে নিয়ে এল।
## নন্দীগ্রামে কেন এত গুরুত্ব?
নন্দীগ্রাম শুধু একটি বিধানসভা কেন্দ্র নয়, বাংলার রাজনীতিতে এটি অত্যন্ত প্রতীকী আসন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সেই নির্বাচনের ফলাফল রাজ্য রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছিল।
পরবর্তী সময়ে নন্দীগ্রাম বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি পায়। আসন্ন উপনির্বাচনে বিজেপি এই কেন্দ্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। দলের তরফে নিহত নেতা চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানি রথকে প্রার্থী করা হয়েছে। ফলে আবেগ, স্থানীয় সংগঠন এবং রাজনৈতিক প্রতীকের দিক থেকে নন্দীগ্রামের লড়াই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। <Cite refs={\(“turn0news11″\)}/>
এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল যদি কংগ্রেসকে সমর্থন করে বিজেপির বিরুদ্ধে একক প্রার্থী দাঁড় করাতে পারত, তাহলে ভোটের অঙ্ক কিছুটা বদলাতে পারত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। কিন্তু জোট ভেস্তে যাওয়ায় বিরোধী ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়েছে।
## রেজিনগরেও ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা
মুর্শিদাবাদ জেলার রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রেও উপনির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূলের প্রভাবও বেড়েছে। ফলে তৃণমূল ও কংগ্রেস পৃথকভাবে লড়াই করলে ভোট ভাগাভাগির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এর পাশাপাশি বিজেপিও এই কেন্দ্রে নিজেদের সংগঠন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে রেজিনগরে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। তৃণমূল ও কংগ্রেসের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় বিজেপি সেই পরিস্থিতির রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে ভোটের ফলাফল নির্ভর করবে প্রার্থী নির্বাচন, স্থানীয় সংগঠন, সংখ্যালঘু ভোটের গতিপ্রকৃতি, বিরোধী ভোটের বিভাজন এবং শেষ মুহূর্তের প্রচারের উপর। শুধুমাত্র জোট ভেঙে যাওয়ার কারণে কোনও দলের জয় নিশ্চিত হয়ে যায় না। কিন্তু নির্বাচনী অঙ্কে এর প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই।
## তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সমস্যাও বড় বিষয়
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচন এমন সময়ে হচ্ছে, যখন তৃণমূল কংগ্রেস নিজেই অভ্যন্তরীণ বিরোধের মুখে রয়েছে। দলের নাম, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচনী প্রতীক ‘জোড়াফুল’ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত চলছে।
নির্বাচন কমিশন দুই পক্ষের বক্তব্য শুনেছে এবং প্রয়োজনীয় নথি চেয়েছে। উপনির্বাচনের আগে কোন গোষ্ঠী তৃণমূলের বৈধ পরিচয় ও প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে, তা নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের পাশাপাশি কংগ্রেসের সঙ্গে জোট না হওয়ায় তৃণমূলের সামনে একাধিক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। দলের প্রার্থীকে শুধু বিজেপির বিরুদ্ধে নয়, একইসঙ্গে কংগ্রেস এবং বিদ্রোহী তৃণমূল গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হতে পারে।
## বিরোধী ঐক্যে ফের প্রশ্ন
বাংলায় বিজেপিবিরোধী ভোট একত্রিত করার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। তৃণমূল দাবি করে, বিজেপিকে ঠেকাতে তাদের নেতৃত্বেই বিরোধী শক্তিকে একজোট হতে হবে। কংগ্রেস আবার নিজেদের স্বাধীন রাজনৈতিক অস্তিত্ব বজায় রাখার পক্ষে। এই দুই অবস্থানের সংঘাত থেকেই বারবার জোট আলোচনা ব্যর্থ হচ্ছে।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের ঘটনা দেখিয়ে দিল, জাতীয় স্তরে বিরোধী ঐক্যের কথা বলা হলেও রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক স্বার্থ অনেক সময় সেই ঐক্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। স্থানীয় সংগঠন, প্রার্থী বাছাই, ভোটব্যাঙ্ক এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাব—সবকিছু মিলিয়েই দলগুলি সিদ্ধান্ত নেয়।
তৃণমূলের অভিযোগ, কংগ্রেস প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। কংগ্রেসের বক্তব্য, তারা নিজেদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচনে লড়ছে। দুই দলের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান ভোটারদের সামনে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
## সামনে কী হতে পারে?
আগামী দিনে দুই দলের মধ্যে ফের কোনও আলোচনা হবে কি না, তা এখনই স্পষ্ট নয়। মনোনয়ন পর্ব, প্রচার এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি যত এগোবে, ততই দুই দলের অবস্থান আরও কঠোর হতে পারে। তবে শেষ মুহূর্তে স্থানীয় স্তরে কোনও সমঝোতার চেষ্টা হয় কি না, সেদিকেও নজর থাকবে।
অন্যদিকে, বিজেপি ইতিমধ্যেই তৃণমূল ও কংগ্রেসের দূরত্বকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার করতে পারে। বিজেপির বক্তব্য হতে পারে, বিরোধী দলগুলি নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থের বদলে নিজেদের আসন নিয়ে ব্যস্ত।
সব মিলিয়ে, নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচন শুধু দুই বিধানসভা কেন্দ্রের ভোট নয়। এই নির্বাচন তৃণমূল-কংগ্রেস সম্পর্ক, বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধী ঐক্য, তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং বাংলার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে চলেছে।


