পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রাম বিধানসভা উপনির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দুই গোষ্ঠীর প্রার্থী ঘোষণা, কংগ্রেস ও বামেদের পৃথক লড়াই এবং বিজেপির প্রার্থী বাছাই—সব মিলিয়ে নন্দীগ্রামের ভোটযুদ্ধ এবার আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যেই বিজেপি নন্দীগ্রাম আসনে এমন এক প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে, যা রাজনৈতিক মহলে বিশেষ চর্চা তৈরি করেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর প্রাক্তন ব্যক্তিগত সহকারী প্রয়াত চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানি রথকে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে প্রার্থী করেছে গেরুয়া শিবির।
বিজেপির এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ইতিমধ্যেই নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে আসছে। স্থানীয় আবেগ, চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যুর ঘটনা এবং নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত প্রভাব—এই তিনটি বিষয়কে মাথায় রেখেই বিজেপি প্রার্থী বেছে নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও দলীয়ভাবে প্রার্থী বাছাইয়ের কারণ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনও সামনে আসেনি।
## নন্দীগ্রামে বিজেপির প্রার্থী হাসিরানি রথ
বিজেপির ঘোষিত প্রার্থী হাসিরানি রথ হলেন শুভেন্দু অধিকারীর দীর্ঘদিনের সহযোগী ও প্রাক্তন ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথের মা। চন্দ্রনাথ রথকে চলতি বছরের মে মাসে গুলি করে খুন করা হয়েছিল বলে প্রকাশিত রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়। শুভেন্দু অধিকারীও ওই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরব হয়েছিলেন।
সেই ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যেই চন্দ্রনাথ রথের মাকে নন্দীগ্রাম থেকে প্রার্থী করল বিজেপি। ফলে এই প্রার্থী নির্বাচনকে নিছক সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তাঁদের মতে, প্রয়াত নেতার পরিবারের প্রতি সহানুভূতি, স্থানীয় মানুষের আবেগ এবং শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে পরিবারের সম্পর্ক—সবকিছুকেই নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্ব দিতে পারে বিজেপি।
তবে ভোটে প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচয় কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ, প্রচারের ধরন এবং বিরোধী দলগুলির কৌশলের উপর। নন্দীগ্রামের মতো রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর কেন্দ্রে কোনও প্রার্থীর পারিবারিক পরিচয় অবশ্যই আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কোন ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেবেন, সেটাই ফল নির্ধারণ করবে।
## চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যুকে ঘিরে রাজনৈতিক আবেগ
চন্দ্রনাথ রথ ছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তাঁকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় বিজেপির পক্ষ থেকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। অন্যদিকে, তদন্তের গতিপ্রকৃতি এবং ঘটনায় কারা জড়িত, তা নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে অনুসন্ধান চলেছে।
চন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারকে ঘিরে বিজেপির রাজনৈতিক অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে। এবার তাঁর মা হাসিরানি রথকে প্রার্থী করায় সেই আবেগ সরাসরি নির্বাচনী ময়দানে প্রবেশ করল। বিজেপি এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রয়াত কর্মীর পরিবারের পাশে থাকার বার্তা দিতে চাইছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক প্রচারে কোনও ব্যক্তিগত трагেডিকে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে বিতর্কও তৈরি হতে পারে। বিরোধীরা বিজেপির প্রার্থী নির্বাচনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। বিজেপির পাল্টা বক্তব্য হতে পারে, এটি একজন প্রয়াত কর্মীর পরিবারের প্রতি সম্মান এবং তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত।
## কেন গুরুত্বপূর্ণ নন্দীগ্রাম?
নন্দীগ্রাম শুধু পূর্ব মেদিনীপুরের একটি বিধানসভা কেন্দ্র নয়, রাজ্য রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মঞ্চ। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সেই লড়াই জাতীয় রাজনীতিতেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে শুভেন্দু অধিকারী বিজেপির অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে উঠে আসেন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর—দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হন বলে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী। পরে দুটি আসনের মধ্যে একটি ছেড়ে দেওয়ার কারণে নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়।
ফলে এই উপনির্বাচন বিজেপির কাছে শুধু একটি আসন ধরে রাখার লড়াই নয়। নন্দীগ্রামে নিজেদের সংগঠন ও জনপ্রিয়তা অটুট রয়েছে কি না, তারও পরীক্ষা হবে। একই সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের কাছেও এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নন্দীগ্রামকে ঘিরে দলের অতীত রাজনৈতিক সাফল্য এবং সাম্প্রতিক সাংগঠনিক টানাপোড়েন—দুটিই এখানে প্রভাব ফেলতে পারে।
## তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর প্রার্থী
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী নন্দীগ্রামে সঞ্চিতা প্রধান দে-কে প্রার্থী করেছে। অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠী পৃথকভাবে এহতেশামুল হককে প্রার্থী করেছে।
দুই গোষ্ঠীর পৃথক প্রার্থী ঘোষণায় তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে বিভাজনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুধু প্রার্থী নয়, দলীয় নাম এবং নির্বাচনী প্রতীক নিয়েও দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ রয়েছে। কোন গোষ্ঠী ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে এবং কে জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে বিজেপি নন্দীগ্রামে নিজেদের প্রচারকে আরও জোরদার করতে চাইবে। তৃণমূলের ভোটে বিভাজন হলে তার রাজনৈতিক সুবিধা বিজেপি পেতে পারে। তবে বিরোধী ভোটের ভাগাভাগি কতটা হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
## কংগ্রেস ও বামেদের লড়াইও রয়েছে
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে কংগ্রেস এবং বামেরাও নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। কংগ্রেসের হয়ে মিলন প্রধান এবং বামফ্রন্টের হয়ে সিপিআই প্রার্থী শান্তিগোপাল গিরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বলে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা গিয়েছে।
ফলে নন্দীগ্রামে এবার বহুমুখী লড়াই হতে চলেছে। বিজেপি, তৃণমূলের দুই গোষ্ঠী, কংগ্রেস এবং বাম—সব পক্ষই ভোটের ময়দানে রয়েছে। এর ফলে ভোটের অঙ্ক জটিল হতে পারে। বিশেষ করে বিরোধী ভোট এক জায়গায় না থাকলে বিজেপি সুবিধা পেতে পারে। আবার স্থানীয় প্রার্থী, সংগঠন এবং নির্দিষ্ট এলাকার প্রভাবের উপর ভিত্তি করে ফলাফল অন্য দিকেও যেতে পারে।
## ৬ অক্টোবর ভোট, ৯ অক্টোবর ফলাফল
নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৬ অক্টোবর। ভোটগণনা হবে ৯ অক্টোবর। দুর্গাপুজোর ঠিক আগে এই নির্বাচন হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলির প্রচারে উৎসবের আবহও প্রভাব ফেলতে পারে। মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময় ১৬ সেপ্টেম্বর বলে নির্বাচন সংক্রান্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
দলগুলির হাতে প্রচারের জন্য খুব বেশি সময় নেই। তাই প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই এলাকায় সভা, মিছিল, বাড়ি-বাড়ি প্রচার এবং কর্মী বৈঠক শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিজেপি হাসিরানি রথের পারিবারিক পরিচয় ও চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যুর বিষয় সামনে আনতে পারে। তৃণমূল নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি এবং সরকারের উন্নয়নমূলক কাজকে প্রচারের হাতিয়ার করতে পারে। কংগ্রেস ও বামেরা বিজেপি-তৃণমূল বিরোধী ভোট নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করবে।
সব মিলিয়ে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন এবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াই হতে চলেছে। বিজেপির প্রার্থী হাসিরানি রথকে ঘিরে আবেগ তৈরি হলেও ভোটের ফল নির্ভর করবে সংগঠন, প্রচার, প্রার্থী গ্রহণযোগ্যতা এবং বিরোধী ভোটের বিভাজনের উপর। নন্দীগ্রামের মানুষ শেষ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক বার্তাকে গুরুত্ব দেন, তার উত্তর মিলবে ৯ অক্টোবর ভোটগণনার পর।


