রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত বাংলা সহায়তা কেন্দ্র (Bangla Sahayata Kendra বা BSK)-কে ঘিরে দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ সামনে আসতেই নড়েচড়ে বসল নবান্ন। সরকারি পরিষেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রগুলিতে অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি এবং বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসাজশের অভিযোগের প্রেক্ষিতে রাজ্য সরকার জেলা প্রশাসনকে অবিলম্বে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি নবান্ন থেকে সমস্ত জেলাশাসকের (District Magistrate) কাছে একটি নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। সেই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বাংলা সহায়তা কেন্দ্রগুলিতে পরিষেবা দেওয়ার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সরকারি নিয়ম ভঙ্গ এবং কিছু ক্ষেত্রে আই-প্যাক (I-PAC)-এর সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলা সহায়তা কেন্দ্রগুলির মূল উদ্দেশ্য হল সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প, শংসাপত্র, আবেদনপত্র এবং ডিজিটাল পরিষেবা সহজে ও বিনামূল্যে অথবা নির্ধারিত সরকারি ফি-র বিনিময়ে প্রদান করা। কিন্তু অভিযোগ, কিছু কেন্দ্রে এই পরিষেবার জন্য অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে। কোথাও আবার সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে অপ্রয়োজনীয় খরচ করানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হল, কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত বা বেসরকারি সংস্থার কর্মীদের মাধ্যমে সরকারি পরিষেবার কাজে অযাচিত প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কিছু অভিযোগে আই-প্যাকের (Indian Political Action Committee) সঙ্গে যোগসাজশের বিষয়টিও সামনে এসেছে। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সরকার পৃথকভাবে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে এবং এখনও পর্যন্ত কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা সরকারি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি।
নবান্নের নির্দেশে বলা হয়েছে, প্রতিটি জেলার প্রশাসনকে নিজেদের অধীনস্থ সমস্ত বাংলা সহায়তা কেন্দ্রের কার্যকলাপ পর্যালোচনা করতে হবে। কোথাও আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি বা সরকারি নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে রাজ্য সরকারের কাছে জানাতে বলা হয়েছে।
প্রশাসনিক মহলের মতে, বাংলা সহায়তা কেন্দ্র সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা কেন্দ্র। লক্ষ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের আবেদন, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প, কাস্ট সার্টিফিকেট, আয় শংসাপত্র, জন্ম-মৃত্যু সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক পরিষেবার জন্য এই কেন্দ্রগুলির উপর নির্ভর করেন। ফলে এই ব্যবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি পরিষেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে নিয়মিত অডিট, ডিজিটাল নজরদারি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিষেবা গ্রহণকারীদের কাছ থেকেও নিয়মিত প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করলে অনিয়ম দ্রুত ধরা সম্ভব হবে।
তবে এই মুহূর্তে উল্লেখ করা জরুরি যে, অভিযোগ সামনে এলেও তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সরকার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট জেলাগুলিকে দ্রুত রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলি প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা যাবে না।
রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে বাংলা সহায়তা কেন্দ্রগুলির কার্যক্রমে আরও বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে বলে প্রশাসনিক মহলের একাংশের আশা। এখন তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের।


