পশ্চিমবঙ্গে ফের কোটি কোটি টাকা উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। এবার মালদহ শহরের একটি আবাসনের ফ্ল্যাটে পুলিশের অভিযানে উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ। রবিবার গভীর রাতে মালদহ ও দক্ষিণ দিনাজপুর পুলিশের যৌথ অভিযানে ওই ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালানো হয়। প্রাথমিকভাবে প্রায় আড়াই কোটি টাকা গণনা করা হলেও, তদন্তকারীদের দাবি অনুযায়ী টাকা গণনার কাজ দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে এবং মোট অঙ্ক আরও বাড়তে পারে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই অভিযানের সূত্রপাত হয় গত মাসে দক্ষিণ দিনাজপুরে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ কফ সিরাপ উদ্ধার হওয়ার ঘটনার তদন্ত থেকে। সেই মামলায় ইতিমধ্যেই কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে মালদহের একটি ফ্ল্যাটে বিপুল নগদ অর্থ মজুত থাকার তথ্য সামনে আসে। সেই সূত্র ধরেই রবিবার রাতে অভিযান চালানো হয়।
তল্লাশি চলাকালীন ফ্ল্যাট থেকে একের পর এক টাকার বান্ডিল উদ্ধার হতে থাকে। এত পরিমাণ নগদ অর্থ থাকায় তা গোনার জন্য বিশেষ টাকা গোনার মেশিন আনতে হয়। পুলিশ সূত্রে খবর, উদ্ধার হওয়া অর্থের উৎস, বৈধতা এবং এর সঙ্গে নিষিদ্ধ ওষুধ বা কফ সিরাপ চক্রের কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, উদ্ধার হওয়া ফ্ল্যাটটির মালিক দিলীপ সাহা। পাশাপাশি একটি ছোট ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা বা ফার্মা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের সন্দেহ, তাঁর ব্যবসার আড়ালে অবৈধ আর্থিক লেনদেন বা নিষিদ্ধ ওষুধ পাচারের সঙ্গে কোনও যোগ থাকতে পারে। তবে তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় পুলিশ এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করেনি।
পুলিশের দাবি, দক্ষিণ দিনাজপুরে উদ্ধার হওয়া প্রায় ১,৫০০ বোতল নিষিদ্ধ কফ সিরাপ মামলার তদন্তই এই বিপুল নগদ উদ্ধারের পথ খুলে দেয়। ওই মামলায় ধৃতদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মালদহের ফ্ল্যাটে হানা দেওয়া হয়। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই নগদ অর্থ অবৈধ ব্যবসার লভ্যাংশ হতে পারে। যদিও এই দাবি এখনও তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
অভিযানের সময় গোটা এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ। ফ্ল্যাটে দীর্ঘক্ষণ ধরে তল্লাশি চালানো হয় এবং একাধিক নথি, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ব্যবসায়িক নথিপত্র এবং অন্যান্য আর্থিক লেনদেনও খতিয়ে দেখছে। উদ্ধার হওয়া নগদ অর্থের প্রকৃত উৎস নির্ধারণে আয়কর বিভাগ বা অন্যান্য কেন্দ্রীয় সংস্থার সাহায্য নেওয়া হতে পারে বলেও প্রশাসনিক সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।
এই ঘটনায় স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, একটি সাধারণ আবাসনের ফ্ল্যাটে এত বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ কীভাবে জমা রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি একটি ছোট ফার্মা ব্যবসার সঙ্গে এত বড় অঙ্কের নগদ অর্থের সম্পর্ক কী, তা নিয়েও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ ওষুধ ব্যবসা, নিষিদ্ধ কফ সিরাপ পাচার এবং নগদ অর্থের লেনদেনের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তে স্পষ্ট হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় নিষিদ্ধ ওষুধ ও মাদক চক্রের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযান চালানো হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় মালদহের এই ঘটনাকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এই মুহূর্তে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, তদন্ত এখনও চলছে। উদ্ধার হওয়া অর্থের প্রকৃত উৎস, গ্রেপ্তার ব্যক্তির ভূমিকা এবং এই চক্রে আরও কেউ জড়িত কি না, তা জানতে জোরদার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত বলে ধরা যাবে না।
মালদহের এই নগদ উদ্ধারের ঘটনায় রাজ্যজুড়ে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। তদন্ত যত এগোবে, ততই এই চক্রের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও আর্থিক লেনদেন সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করছে তদন্তকারী সংস্থা।


