রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর সরকারি স্কুলের ইউনিফর্মের রং বদল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা জল্পনা চলছিল। বিশেষ করে তৃণমূল সরকারের আমলে চালু হওয়া **নীল-সাদা ইউনিফর্ম** থাকবে নাকি নতুন রং চালু হবে, তা নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষক এবং পড়ুয়াদের মধ্যে কৌতূহল ছিল। এবার সেই বিতর্কে স্পষ্ট অবস্থান জানালেন রাজ্যের **স্কুল শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মণ**। তিনি জানিয়েছেন, সরকারি নির্দেশে কোনও নির্দিষ্ট রং চাপিয়ে দেওয়া হবে না। বরং **প্রতিটি স্কুল তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইউনিফর্মের রং বেছে নিতে পারবে।**
বিকাশ ভবনে এক সাংবাদিক বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ইউনিফর্মের রং নির্বাচন করার স্বাধীনতা সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে। কোনও স্কুল চাইলে নীল-সাদা রংও রাখতে পারে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে—**ইউনিফর্মে আর ‘বিশ্ববাংলা’ লোগো ব্যবহার করা যাবে না।** অর্থাৎ রং নিয়ে বাধ্যবাধকতা না থাকলেও সরকারি প্রতীক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন নীতি কার্যকর হবে।
উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে অধিকাংশ সরকারি ও সরকার-পোষিত বিদ্যালয়ে নীল-সাদা রঙের ইউনিফর্ম চালু করা হয়েছিল। সেই পোশাকে ‘বিশ্ববাংলা’ লোগোও যুক্ত ছিল। সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই সেই নীতি পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রথমদিকে শোনা গিয়েছিল, সমস্ত স্কুলে নতুন রঙের ইউনিফর্ম চালু করা হবে। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক ঘোষণার পর পরিষ্কার হয়েছে, রাজ্য সরকার কোনও একক রং নির্ধারণ করছে না।
দীপক বর্মণ বলেন, প্রতিটি বিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আবেগের সঙ্গে তাদের ইউনিফর্ম জড়িয়ে থাকে। তাই একাধিক দশক ধরে যে রং কোনও স্কুল ব্যবহার করছে, তা পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ই নেবে। সরকারের ভূমিকা হবে শুধুমাত্র নীতিগত দিকনির্দেশনা দেওয়া। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিভিন্ন বিদ্যালয় নিজেদের প্রয়োজন এবং ঐতিহ্য অনুযায়ী ইউনিফর্ম নির্ধারণ করতে পারবে।
শিক্ষা দপ্তরের মতে, এই নীতির ফলে স্কুলগুলির প্রশাসনিক স্বাধীনতা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন ইউনিফর্ম তৈরির জন্য অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপও এড়ানো সম্ভব হবে। কারণ সব স্কুলকে একসঙ্গে নতুন পোশাক কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে না। যেসব বিদ্যালয় বর্তমান ইউনিফর্ম বজায় রাখতে চাইবে, তারা তা করতে পারবে, তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী লোগো সংক্রান্ত নির্দেশ মানতে হবে।
শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত। ইউনিফর্মের রং পরিবর্তনের চেয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং নতুন পাঠ্যক্রম চালুর মতো বিষয়গুলিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অন্যদিকে অভিভাবকদেরও একটি বড় অংশ মনে করছেন, ইউনিফর্ম পরিবর্তন না হলে তাঁদের অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয়ও কমবে।
এদিকে শিক্ষামন্ত্রী একই সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় আরও একাধিক পরিবর্তনের কথাও জানান। তিনি বলেন, জাতীয় শিক্ষানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যতে নতুন পাঠ্যক্রম চালু করা হবে এবং সেই লক্ষ্যে একটি বিশেষ সিলেবাস কমিটিও গঠন করা হয়েছে। ফলে ইউনিফর্ম নীতির পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক আধুনিকীকরণের দিকেও সরকার জোর দিচ্ছে |
প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, ইউনিফর্ম সংক্রান্ত এই নতুন নীতির ফলে ভবিষ্যতে কোনও বিভ্রান্তি থাকবে না। বিদ্যালয়গুলিকে দ্রুত নিজেদের সিদ্ধান্ত জানাতে বলা হতে পারে, যাতে নতুন শিক্ষাবর্ষের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া যায়। একই সঙ্গে লোগো ব্যবহারের বিষয়ে শিক্ষা দপ্তর পৃথক নির্দেশিকাও প্রকাশ করতে পারে।
সব মিলিয়ে, **সরকারি স্কুলের ইউনিফর্ম নিয়ে জল্পনার অবসান ঘটিয়ে শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মণ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—ইউনিফর্মের রং নির্ধারণ করবে স্কুল কর্তৃপক্ষ। নীল-সাদা রং ব্যবহারেও আপত্তি নেই, তবে ‘বিশ্ববাংলা’ লোগো আর ব্যবহার করা যাবে না।** এই সিদ্ধান্ত রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।


