পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও সরকার-পোষিত স্কুলগুলির **মিড-ডে মিল (Mid-Day Meal)** প্রকল্পে বড় পরিবর্তনের সূচনা করল রাজ্য সরকার। শনিবার কলকাতার তারাতলায় ইসকনের **অন্নামৃত মেগা কিচেন** থেকে নতুন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী **শুভেন্দু অধিকারী**। সেই অনুষ্ঠানে তিনি মিড-ডে মিলের নতুন খাদ্যতালিকা ঘোষণা করেন এবং জানান, পড়ুয়াদের জন্য আরও পুষ্টিকর ও সুষম খাবার নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
প্রথম পর্যায়ে কলকাতা পুরনিগম এলাকার **৫০০টি সরকারি ও সরকার-পোষিত স্কুলের প্রায় ৪৪ হাজার ছাত্রছাত্রী** এই নতুন পরিষেবার আওতায় এসেছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগামী তিন মাসের মধ্যে এই প্রকল্পের পরিধি আরও বাড়িয়ে প্রায় **আড়াই লক্ষ পড়ুয়ার** কাছে এই পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন মেনুতে শুধুমাত্র সাধারণ ভাত নয়, বরং বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিকর খাবারের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রধান খাদ্য হিসেবে থাকবে **ভাত, পোলাও এবং খিচুড়ি**। প্রোটিনের উৎস হিসেবে থাকবে **পনির, ছানা, সয়াবিন**, পাশাপাশি মরশুমি সবজি ও বাদাম। খাবারের শেষে পড়ুয়াদের জন্য রাখা হবে **মরশুমি ফল অথবা মিষ্টি**। সরকারের দাবি, এই নতুন মেনু শিশুদের পুষ্টির চাহিদা পূরণে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
মিড-ডে মিলে ডিম থাকবে কি না, তা নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই জল্পনার অবসান ঘটিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, **ইসকন সাত্ত্বিক নিরামিষ খাবার পরিবেশন করলেও পড়ুয়াদের ডিম দেওয়া বন্ধ হচ্ছে না।** বরং স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (Self Help Group) মহিলাদের মাধ্যমে **সপ্তাহে দু’দিন আলাদা করে সেদ্ধ ডিম** সরবরাহ করা হবে। অর্থাৎ নিরামিষ খাবারের পাশাপাশি ডিমের মাধ্যমে প্রোটিনের ঘাটতিও পূরণ করা হবে।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, মিড-ডে মিলের দায়িত্ব ইসকনের হাতে গেলেও **রাঁধুনি ও সহায়িকাদের চাকরি যাবে না**। তাঁদের বর্তমান কাজ বজায় থাকবে এবং ইসকনের খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি আগস্ট মাস থেকে রাঁধুনি ও সহায়িকাদের মাসিক ভাতাও **১,০০০ টাকা বৃদ্ধি** করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে বহু কর্মী স্বস্তি পেয়েছেন।
তারাতলার অন্নামৃত মেগা কিচেন অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি। এখান থেকে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে রান্না করা হবে। রান্না করা খাবার **সিল করা বিশেষ কন্টেনারে**, জিপিএস-সজ্জিত বৈদ্যুতিক গাড়ির মাধ্যমে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া হবে। রান্না ও পরিবহণের পুরো প্রক্রিয়া **এআই-ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার** মাধ্যমে নজরদারিতে থাকবে, যাতে খাবারের মান বজায় থাকে।
পুষ্টিবিদদের মতে, শিশুদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, শাকসবজি ও ফলের সঠিক ভারসাম্য থাকা অত্যন্ত জরুরি। নতুন খাদ্যতালিকায় সেই দিকটি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পনির, ছানা, সয়াবিন এবং ডিমের সংযোজন শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ও পুষ্টির ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে নিয়মিত ও সময়মতো খাবার সরবরাহ এবং মান বজায় রাখার উপর।
সব মিলিয়ে, **রাজ্যের মিড-ডে মিল প্রকল্পে নতুন যুগের সূচনা করল সরকার।** পোলাও, খিচুড়ি, পনির, ছানা, সয়াবিন, মরশুমি ফল বা মিষ্টির মতো বৈচিত্র্যময় খাবারের পাশাপাশি সপ্তাহে দু’দিন সেদ্ধ ডিম দেওয়ার সিদ্ধান্তে পড়ুয়াদের আরও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ৪৪ হাজার পড়ুয়া এই সুবিধা পেলেও আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রকল্পটি আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।


