পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজোর ইতিহাসে বনেদি পুজোর আলাদা মর্যাদা রয়েছে। সেই ঐতিহ্যের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় পূর্ব বর্ধমানের পানাগড়ের সোঁয়াই গ্রামের মুখোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজো। এ বছর এই পুজো ৩৩৪ বছরে পা দিয়েছে। শুধু প্রাচীনত্ব নয়, এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্বপ্নাদেশ, বর্ধমানের মহারাজার পথ ছেড়ে দাঁড়ানোর কিংবদন্তি এবং শতাব্দী প্রাচীন রীতিনীতির এক অনন্য ধারাবাহিকতা। আজও সেই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখে পুজোয় সামিল হন শুধু পরিবারের সদস্যরাই নন, আশপাশের গ্রামের হাজারো মানুষও।
### শুরু ঔরঙ্গজেবের আমলে
এই পুজোর সূত্রপাত ১৬৯৩ খ্রিস্টাব্দে (বাংলা ১১০০ সন)। তখন দিল্লির মসনদে সম্রাট ঔরঙ্গজেব। সোঁয়াই গ্রামে বসবাস করতেন পরিবারের পূর্বপুরুষ বাসুদেব মুখোপাধ্যায়। যদিও তাঁদের আদি নিবাস ছিল বর্ধমানের ফরিদপুরে। পড়াশোনার জন্য সোঁয়াই গ্রামে এসে তিনি এখানকারই এক কন্যাকে বিয়ে করেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
লোককথা অনুযায়ী, এক রাতে বাসুদেববাবু স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নে মা দুর্গা তাঁকে জানান, ফরিদপুরে তাঁর কাঠামো অপূজিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সেই নির্দেশ পাওয়ার পর তিনি আর দেরি করেননি। তিন পুত্র ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ফরিদপুরে গিয়ে পারিবারিক দুর্গার কাঠামো কাঁধে তুলে সোঁয়াই গ্রামের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন।
### মহারাজার পথ ছেড়ে দাঁড়ানোর কিংবদন্তি
সোঁয়াই গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছতেই ঘটে এই পুজোর ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনা। সেই সময় উল্টো দিক থেকে বর্ধমানের মহারাজা সফর শেষে ফিরছিলেন। রাজপথে কাঠামো নিয়ে এগিয়ে যাওয়া বাসুদেব মুখোপাধ্যায়কে দেখে রাজার পাইক-বরকন্দাজরা রাস্তা ছেড়ে দাঁড়াতে বলেন।
কিন্তু বাসুদেববাবু জানিয়ে দেন, “মায়ের কাঠামো নিয়ে আমরা পথ ছাড়ব না।”
ঘটনার কথা শুনে মহারাজা নিজে এগিয়ে আসেন। তিনি জানতে পারেন, দেবীর কাঠামো নিয়ে যাত্রা চলছে। এরপর তিনিই সম্মান জানিয়ে পথ ছেড়ে দাঁড়ান। শুধু তাই নয়, এই পুজো যাতে জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তার জন্য মুখোপাধ্যায় পরিবারকে জমি, পুকুর এবং সম্পত্তিও দান করেন বলে পারিবারিক ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
### পুরনো কাঠামোই আজও পুজোর প্রাণ
সেই বছর থেকেই পুরনো কাঠামোয় মাটি ও রঙের প্রলেপ দিয়ে প্রতিমাকে মৃন্ময়ী রূপ দেওয়া শুরু হয়। আশ্চর্যের বিষয়, আজও সেই কাঠামোকেই সংরক্ষণ করে প্রতি বছর নতুন করে প্রতিমা গড়া হয়। বিসর্জনের পর কাঠামোটি বাড়ির পুকুর থেকে তুলে এনে সযত্নে রেখে দেওয়া হয় এবং পরের বছর আবার সেটিতেই খড়, মাটি ও রঙের কাজ হয়।
### আজও অটুট শতাব্দী প্রাচীন রীতি
৩৩৪ বছর পেরিয়েও এই পুজোর রীতিনীতিতে বড় কোনও পরিবর্তন আসেনি। পরিবারের প্রাচীন পুঁথি অনুসারেই সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
* মহাষষ্ঠীতে কল্পারম্ভের মাধ্যমে পুজোর সূচনা।
* বিদ্যেশ্বর মহাদেব মন্দিরের তাঁতপুকুর থেকে পালকিতে করে নবপত্রিকা আনা হয়।
* মহাষ্টমীর সন্ধিপুজোয় ৬ বস্তা আতপ চালের মহারাস নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়।
* মহানবমীতে মোষ, মেষ, ছাগ ও আখ বলির প্রাচীন রীতি আজও পালন করা হয়।
* পুজোর তিন দিন ধরে গব্য ঘৃতের মহাপ্রদীপ নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালিয়ে রাখা হয় এবং পরিবারের সদস্যরা পালা করে তার দায়িত্ব পালন করেন।
### গ্রামের সকলের পুজো
যদিও এটি পারিবারিক পুজো, তবুও শুরু থেকেই পূর্বপুরুষরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে গ্রামের প্রত্যেক মানুষ এই উৎসবের অংশ হবেন। সেই প্রথা আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
পুজোর দিনগুলোয় সোঁয়াই গ্রাম ছাড়াও আশপাশের বহু গ্রামের মানুষ ভিড় জমান। সবাই একসঙ্গে পাত পেড়ে অন্নপ্রসাদ গ্রহণ করেন। আরতি, সন্ধিপুজো এবং বিসর্জনকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
### ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন
সময়ের সঙ্গে গ্রাম বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রাও পাল্টেছে। কিন্তু মুখোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজোর মূল ঐতিহ্য অপরিবর্তিত রয়েছে। আজও শতাব্দী প্রাচীন নিয়ম মেনে দেবীর আরাধনা হয়, আর সেই ঐতিহ্য দেখতে প্রতিবছর দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সোঁয়াই গ্রামে আসেন।
### ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকা এক বনেদি পুজো
ঔরঙ্গজেবের আমল থেকে শুরু হওয়া এই পুজো শুধু একটি পারিবারিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও এক মূল্যবান অংশ। স্বপ্নাদেশের কাহিনি, মহারাজার সম্মান প্রদর্শনের কিংবদন্তি, প্রাচীন কাঠামো সংরক্ষণের রীতি এবং গ্রামবাসীর সম্মিলিত অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে পানাগড়ের সোঁয়াই গ্রামের মুখোপাধ্যায় বাড়ির ৩৩৪ বছরের দুর্গাপুজো আজও বাংলার বনেদি পুজোর ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে রয়েছে।


