বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে ফের জোরালো বার্তা। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্য, প্রশ্নটা আর তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন কি না, তা নয়। বরং এখন মূল প্রশ্ন হল, কীভাবে এমনভাবে দেশে ফেরা সম্ভব, যাতে বাংলাদেশের মানুষ এবং দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে। ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, আইন মেনেই এবং শান্তিপূর্ণভাবে নিজের দেশে ফিরতে চান তিনি। তাঁর এই মন্তব্যের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, তাঁর প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা এবং দেশে চলতে থাকা আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে ফের জোরদার হয়েছে আলোচনা।
শেখ হাসিনার দাবি, বাংলাদেশে ফেরার অধিকার তাঁর রয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কোনও ন্যায়সঙ্গত আইন তাঁকে নিজের মাতৃভূমিতে ফেরার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। তবে তিনি এটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, দেশে ফেরার পথটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সেই কারণেই কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে দেশে ফিরবেন, সেটিই এখন তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই বক্তব্য এমন একটি সময়ে সামনে এল, যখন শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের দাবি নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারত চলে আসেন হাসিনা। এরপর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বাংলাদেশে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দেশে ফেরার ইচ্ছা শেখ হাসিনা এর আগেও প্রকাশ করেছেন। চলতি বছরের আগস্টে একটি ভার্চুয়াল ভাষণে তিনি বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। তবে এবার তাঁর বক্তব্যে নির্দিষ্ট সময়সীমা হিসেবে ডিসেম্বরের কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ শুধু রাজনৈতিকভাবে দেশে ফেরার ইচ্ছা নয়, চলতি বছরের শেষের মধ্যেই ফেরার একটি লক্ষ্যও তিনি প্রকাশ্যে জানিয়েছেন।
তবে দেশে ফিরলেই তাঁর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হতে পারে—এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা এবং বিচারপ্রক্রিয়া চলছে। তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁর প্রত্যাবর্তন তাই শুধুমাত্র একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ঘটনা হবে না; এর সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা এবং নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।
শেখ হাসিনা অবশ্য জানিয়েছেন, তিনি পালিয়ে থাকতে চান না। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর হল, নিজের জনগণের কাছে ফিরতে চান তিনি এবং প্রয়োজন হলে দেশের আইন অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখিও হতে প্রস্তুত। তিনি এমনও জানিয়েছেন যে, জনতার কল্যাণের জন্য কারাবাসের মূল্য দিতেও তিনি প্রস্তুত। তাঁর এই মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে দেশে ফেরার ক্ষেত্রে আইনি পরিণতি নিয়ে তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞ নন।
হাসিনার বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর দেশে ফেরার বিষয়টি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়েও বৃহত্তর রাজনৈতিক ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। তিনি চান, এমন একটি পরিস্থিতিতে দেশে ফিরতে, যাতে তাঁর প্রত্যাবর্তনের কারণে সাধারণ মানুষের উপর নতুন করে কোনও অস্থিরতা তৈরি না হয়। সেই কারণেই ‘কখন ফিরবেন’ প্রশ্নের তুলনায় ‘কীভাবে ফিরবেন’ প্রশ্নটিকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
এই বক্তব্যের পিছনে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে। ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নত করা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁর বিভিন্ন প্রকাশ্য বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সংবেদনশীল বিষয় হয়ে রয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের খবরও সামনে এসেছে। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। ফলে কূটনৈতিক স্তরে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে যোগাযোগ বাড়ছে বলেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু শেখ হাসিনাকে ঘিরে মতপার্থক্য এখনও রয়েছে।
বাংলাদেশের বর্তমান সরকার হাসিনাকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে আগেও ভারতের কাছে অবস্থান জানিয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে থাকা বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে তাঁকে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছে ঢাকা। ভারতের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবেচনা করা হবে। ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে না; এর সঙ্গে ভারতীয় আইন, বাংলাদেশের আইনি দাবি এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কও জড়িত।
এই কারণেই হাসিনার ‘ডিসেম্বরে ফিরব’ মন্তব্যকে সরাসরি দেশে ফেরার চূড়ান্ত ঘোষণা হিসেবে দেখছেন না অনেক পর্যবেক্ষক। তিনি নিজেই বলেছেন, কীভাবে ফিরবেন সেই বিষয়টি এখনও নির্ধারিত হয়নি। অর্থাৎ সময়সীমার কথা জানালেও প্রত্যাবর্তনের নির্দিষ্ট রুট, আইনি প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিংবা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কোনও সমঝোতা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে এখনও বিস্তারিত কিছু প্রকাশ্যে আসেনি।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলির একটি হল তাঁর নিরাপত্তা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক রাজনৈতিক ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। তাঁর সরকারের সময়কার কর্মকাণ্ড নিয়েও নানা অভিযোগ উঠেছে। ফলে দেশে ফেরার পর তাঁর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হাসিনা নিজেও ‘কীভাবে’ ফিরবেন—এই প্রশ্নের উপর জোর দিয়ে সম্ভবত সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছেন।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাঁর প্রত্যাবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দলটি ২০২৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি এবং রাজনৈতিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। হাসিনা দেশে ফিরলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ, দলীয় নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলটির ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে এখনও নানা প্রশ্ন রয়েছে।
হাসিনার সমর্থকদের কাছে তাঁর দেশে ফেরা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ঘটনা হতে পারে। অন্যদিকে তাঁর বিরোধীরা মনে করেন, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচারপ্রক্রিয়া আগে শেষ হওয়া প্রয়োজন। ফলে তাঁর প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
তবে শেখ হাসিনা নিজের বক্তব্যে রাজনৈতিক সংঘাতের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের কথাই বলেছেন। তাঁর দাবি, তিনি আইন মেনেই দেশে ফিরতে চান। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সম্ভবত বোঝাতে চাইছেন যে তাঁর প্রত্যাবর্তন যেন নতুন করে কোনও সংঘাত বা অস্থিরতার কারণ না হয়।
ভারতের জন্যও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনা গত দুই বছর ধরে ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁর নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে ভারতকে একদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজের ভূখণ্ডে আশ্রয় নেওয়া একজন প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধানের বিষয়টিও সামলাতে হচ্ছে। ফলে হাসিনার ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দিল্লির জন্যও নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত, জলবণ্টন, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে টানাপোড়েন যাতে এই সম্পর্কের অন্যান্য ক্ষেত্রকে প্রভাবিত না করে, সেটিও দুই সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও ইতিমধ্যে আলোচনা চলছে। ফলে আগামী কয়েক মাস ভারত-বাংলাদেশ কূটনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এর মধ্যে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এতদিন মূল প্রশ্ন ছিল, তিনি আদৌ দেশে ফিরবেন কি না। এবার তিনি নিজেই ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরার কথা বলেছেন। ফলে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে—এই প্রত্যাবর্তন কি সত্যিই হবে? হলে কোন আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হবে? তাঁকে কি গ্রেপ্তার করা হবে? তাঁর বিরুদ্ধে চলা মামলাগুলির কী হবে? এবং সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর দেশে ফেরার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?
এই প্রশ্নগুলির কোনওটিরই এখনও নিশ্চিত উত্তর নেই। কারণ হাসিনা সময়সীমা জানালেও প্রত্যাবর্তনের পদ্ধতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য দেননি। বরং তিনি নিজেই বলেছেন, আসল প্রশ্ন হল কীভাবে ফিরবেন। তাই ডিসেম্বরের ঘোষণা আপাতত একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে দেশ ছাড়ার প্রায় দুই বছর পর তিনি এবার নির্দিষ্ট সময়সীমা হিসেবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের কথা বলেছেন। তাঁর দাবি, দেশের মানুষের কাছে ফেরার অধিকার তাঁর রয়েছে এবং তিনি আইন মেনেই শান্তিপূর্ণভাবে দেশে ফিরতে চান। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজনে কারাবাসের পরিণতিও মেনে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু তাঁর প্রত্যাবর্তনের বাস্তব পথ এখনও স্পষ্ট নয়। ভারত-বাংলাদেশ কূটনীতি, বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া, তাঁর নিরাপত্তা এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ—সবকিছু মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা আগামী মাসগুলিতে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে থাকতে পারে।


