বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পত্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে তাঁর বাংলাদেশে থাকা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়ার পর সামনে এসেছে—ঠিক কতটা সম্পত্তি তাঁর নিজের নামে রয়েছে এবং কোন কোন সম্পত্তি পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে। ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা থেকে শেখ হাসিনার নিজের নামে থাকা সম্পদের একটি হিসাব পাওয়া যায়। সেই হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ঘোষিত মূল্য ছিল প্রায় **৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা**।
তবে এই ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বলতে তাঁর নামে ঘোষিত সম্পত্তির মূল্য বোঝায়। বিভিন্ন তদন্তে শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে যুক্ত বিপুল পরিমাণ সম্পদ অবরুদ্ধ করার তথ্যও সামনে এসেছে। তাই দুই ধরনের হিসাবকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
## হলফনামায় কী কী সম্পত্তি দেখিয়েছিলেন?
২০২৪ সালের নির্বাচনী হলফনামায় শেখ হাসিনা নিজের নামে নগদ অর্থ হিসেবে দেখিয়েছিলেন প্রায় **২৮ হাজার ৫০০ টাকা**। ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তাঁর জমা ছিল প্রায় **২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা**। এছাড়া ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং প্রায় ৫৫ লাখ টাকার স্থায়ী আমানতের কথাও উল্লেখ ছিল।
অর্থাৎ, তাঁর ঘোষিত সম্পদের একটি বড় অংশই ছিল আর্থিক সঞ্চয় ও আমানতের আকারে। পাশাপাশি ছিল যানবাহন, সোনা, আসবাব এবং জমিজমা।
## তিনটি গাড়ি, সোনা ও আসবাবও সম্পত্তির অংশ
নির্বাচনী হলফনামায় শেখ হাসিনা মোট **তিনটি মোটরগাড়ির** কথা উল্লেখ করেছিলেন। এর মধ্যে একটি উপহার হিসেবে পাওয়া বলে জানানো হয় এবং তার মূল্য উল্লেখ করা হয়নি। অন্য দুটি গাড়ির মূল্য সম্মিলিতভাবে প্রায় **৪৭.৫ লাখ টাকা** দেখানো হয়েছিল।
এছাড়া সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর মূল্য প্রায় **১৩.২৫ লাখ টাকা** এবং আসবাবের মূল্য **৭.৪ লাখ টাকা** হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
## কৃষিজমি রয়েছে একাধিক জেলায়
শেখ হাসিনার নামে কৃষিজমিও রয়েছে। হলফনামায় প্রায় **১৫.৩ বিঘা কৃষিজমির** কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এই জমিগুলি টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ সদর, গাজীপুর এবং রংপুরে রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে কেনা জমির মূল্য হিসেবে প্রায় **৬.৭৮ লাখ টাকা** দেখানো হয়েছিল। জমির একটি অংশ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বলেও তথ্য রয়েছে।
## টুঙ্গিপাড়ায় তিনতলা বাড়িও রয়েছে
শেখ হাসিনার সম্পত্তির তালিকায় গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জমির সঙ্গে একটি তিনতলা ভবনের কথাও রয়েছে। প্রায় **৬.১০ শতক জমির** অংশে এই ভবন রয়েছে এবং হলফনামায় সম্পত্তিটির অর্জনকালীন মূল্য প্রায় **৫ লাখ টাকা** দেখানো হয়েছিল।
তবে সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য এবং হলফনামায় উল্লেখ করা অর্জনমূল্য এক বিষয় নয়। তাই পুরনো নথিতে থাকা মূল্য দিয়ে আজকের বাজারদর বিচার করা যাবে না।
## পূর্বাচলে শেখ হাসিনার নামে প্লট
ঢাকার পূর্বাচলেও শেখ হাসিনার নামে একটি প্লটের তথ্য রয়েছে। নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, সেই প্লটের মূল্য প্রায় **৩৪.৭৬ লাখ টাকা** দেখানো হয়েছিল।
এখানেই অবশ্য আরও বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর নিজের পাশাপাশি তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ, বোন শেখ রেহানা এবং রেহানার দুই সন্তানের নামেও পূর্বাচলে ১০ কাঠা করে প্লট বরাদ্দের তথ্য সামনে এসেছে। মোট ছয়জনের নামে ৬০ কাঠা জমি বরাদ্দের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা হয়েছে।
## ২০০৮ সালের হলফনামা নিয়ে ACC-র প্রশ্ন
শেখ হাসিনার সম্পত্তি নিয়ে বিতর্ক অবশ্য শুধু ২০২৪ সালের হলফনামাকে ঘিরে নয়। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন বা ACC পুরনো সম্পত্তির হিসাবও পুনরায় খতিয়ে দেখছে।
ACC-এর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের নির্বাচনী হলফনামায় শেখ হাসিনা নিজের নামে থাকা কৃষিজমির পরিমাণ **৬.৫০ একর** হিসেবে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী যাচাইয়ে তাঁর নামে **২৮ একর ৪১ শতকের বেশি স্থাবর সম্পত্তি** থাকার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল বলে কমিশন দাবি করেছে।
অর্থাৎ, ঘোষিত সম্পত্তি এবং তদন্তে পাওয়া সম্পত্তির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে কি না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম বিষয়।
## সম্পত্তি নিয়ে নতুন করে তদন্ত ACC-র
২০২৬ সালে ACC শেখ হাসিনার পুরনো সম্পত্তির হিসাব পুনরায় পরীক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০০৭ সালে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণী এবং ২০০৮ সালের পর অর্জিত সম্পত্তি নিয়েও তথ্য সংগ্রহ করছে কমিশন।
এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পুরনো নথি চাওয়া হয়েছে। ACC-এর বক্তব্য, তাঁর পরিচিত আয়ের উৎসের বাইরে সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তবে এগুলি তদন্তাধীন অভিযোগ—চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত সম্পত্তি বা অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা উচিত নয়।
## ধানমন্ডি ৩২ কি শেখ হাসিনার সম্পত্তি?
শেখ হাসিনার সম্পত্তির তালিকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ওঠা জায়গাগুলির একটি হল ঢাকার **ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি**। তবে বর্তমান নথি অনুযায়ী, এই বাড়িটি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত মালিকানাধীন নয়।
নথি অনুসারে, বাড়িটির মালিকানা বর্তমানে **বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের** হাতে। শেখ হাসিনা একসময় বাড়িটির মালিকানা পেয়েছিলেন এবং পরে সেটি বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টকে দেন। অন্যদিকে ধানমন্ডির **সুধা সদন** শেখ হাসিনার নিজের নামে নয়; সেটির মালিকানা তাঁর সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদের নামে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
## ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে আলাদা তদন্ত
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা BFIU জানিয়েছিল, ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অর্থপাচার মামলায় প্রায় **৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ** দেশে ও বিদেশে অবরুদ্ধ বা জব্দ করা হয়েছে।
এই তদন্তগুলির মধ্যে শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবার এবং ১০টি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিষয় রয়েছে। BFIU-এর হিসাবে, প্রায় **৫৭ হাজার কোটি টাকা দেশের অভ্যন্তরে** এবং **১৯ হাজার কোটি টাকা বিদেশে** থাকা সম্পদের সঙ্গে যুক্ত।
শুধু শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়**। এই অঙ্কের মধ্যে তাঁর পরিবার এবং একাধিক বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত মামলাগুলির সম্পদও রয়েছে। তাই এটিকে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণ হিসেবে দাবি করা সঠিক হবে না।
## বাজেয়াপ্তের নির্দেশের পর কী হবে?
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা ও প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাংলাদেশে থাকা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছে। এখন সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের আইনি প্রক্রিয়া স্পষ্ট করার উদ্যোগ চলছে।
চিফ প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনালের Rules of Procedure-এ প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হলে আগের রায়গুলির ক্ষেত্রেও তা কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি কীভাবে রাষ্ট্রের অধীনে যাবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে তা কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
## শেষ কথা
নথি অনুযায়ী, **২০২৪ সালের নির্বাচনী হলফনামায় শেখ হাসিনা নিজের নামে প্রায় ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ঘোষণা করেছিলেন**। এর মধ্যে ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র, স্থায়ী আমানত, গাড়ি, সোনা, আসবাব, কৃষিজমি, টুঙ্গিপাড়ার সম্পত্তি এবং পূর্বাচলের প্লট রয়েছে।
কিন্তু পুরনো সম্পত্তির হিসাব নিয়ে ACC-র তদন্ত এবং শেখ হাসিনা-সহ তাঁর পরিবার ও অন্য ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সম্পদ অবরুদ্ধ করার বৃহত্তর তদন্ত আলাদা বিষয়। ফলে **৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা তাঁর নিজের নামে ঘোষিত সম্পদের হিসাব; ৭৬ হাজার কোটি টাকা তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তির হিসাব নয়**—এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।


