ঢাকার জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নাম না করে পৌরাণিক চরিত্র কংসের সঙ্গে তুলনা করলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি পুরোহিত ও সেবাইতদের সম্মাননা ভাতাও বিতরণ করেন তিনি। জন্মাষ্টমীর ধর্মীয় আবহের মধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ঢাকার ওই অনুষ্ঠানে শ্রীকৃষ্ণের জন্মকাহিনি এবং কংসের প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তার তুলনা করেন তারেক রহমান। সরাসরি শেখ হাসিনার নাম না নিলেও তাঁর বক্তব্যের ইঙ্গিত যে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর দিকেই, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন এবং সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটেছে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে।
### কংসের উপমায় হাসিনাকে নিশানা
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে কংস হলেন মথুরার অত্যাচারী শাসক, যিনি শ্রীকৃষ্ণের জন্মের আগে থেকেই তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে সেই পৌরাণিক কাহিনির উল্লেখ করেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা টানেন তারেক।
তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সীমিত করে রেখেছিলেন ‘কংসের মতো’ এক শাসক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন শ্রেণি ও রাজনৈতিক মতের মানুষ একসঙ্গে লড়াই এবং আত্মত্যাগের মাধ্যমে সেই শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।
তবে এখানে উল্লেখযোগ্য, বক্তব্যে শেখ হাসিনার নাম সরাসরি উচ্চারণ করেননি তারেক রহমান। তাঁর রাজনৈতিক মন্তব্যের প্রেক্ষিতেই বিষয়টি শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ব্যাখ্যা করেছে।
### ‘গণতন্ত্রের পথে’ বাংলাদেশ
জন্মাষ্টমীর মঞ্চ থেকেই বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দাবি, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে দেশ আবার গণতন্ত্রের পথে এগোচ্ছে। অতীতের শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের মানুষ তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য দীর্ঘদিন লড়াই করেছেন।
তারেকের বক্তব্যে উঠে আসে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর সম্মিলিত আন্দোলনের প্রসঙ্গও। তাঁর দাবি, সেই আন্দোলনের ফলেই পুরনো রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। যদিও তাঁর এই ব্যাখ্যা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্কেরই একটি অংশ।
### হিন্দুদের উদ্দেশে সম্প্রীতির বার্তা
রাজনৈতিক আক্রমণের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের উদ্দেশে সম্প্রীতি ও সমঅধিকারের বার্তাও দেন তারেক রহমান। তাঁর বক্তব্য, দেশের নাগরিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু হিসেবে ভাগ না করে সবাইকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে দেখা উচিত।
ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজনের পরিবর্তে নাগরিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার থাকা প্রয়োজন। একইসঙ্গে ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে দেশের সামাজিক সৌন্দর্যের অংশ হিসেবেও তুলে ধরা হয়।
### পুরোহিত ও সেবাইতদের সম্মাননা
ঢাকার অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র রাজনৈতিক বক্তব্যই নয়, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ছবিও দেখা যায়। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পুরোহিত ও সেবাইতদের হাতে সম্মাননা ভাতাও তুলে দেওয়া হয়। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
### ‘ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা সবার’
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং নাগরিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। তারেক রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় হলেও রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বহু ধর্ম ও মতের মানুষের সহাবস্থান বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ—এই বার্তাই তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি। বিশেষ করে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং সমান অধিকারের প্রসঙ্গটি তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে।
### বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক
তবে জন্মাষ্টমীর মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে কংসের সঙ্গে তুলনা করার ঘটনা রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ও তারেক রহমান দুই ভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের প্রধান মুখ। ফলে এমন একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এই ধরনের তীব্র রাজনৈতিক উপমা নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
একদিকে তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান এবং অতীত শাসনব্যবস্থার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেছেন। অন্যদিকে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মঞ্চে রাজনৈতিক আক্রমণের মাত্রা নিয়েও আলোচনা শুরু হতে পারে।
সব মিলিয়ে, জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা, হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় এবং পুরোহিত-সেবাইতদের সম্মাননা প্রদানের পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে তারেক রহমানের ‘কংস’-উপমা অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তার সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণের এই মিশ্রণ বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির বহুমাত্রিক চিত্রই সামনে আনল।


